ব্যাংক খাতে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দুই বছর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা তুলে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে বিশেষ পরিস্থিতিতে পুনর্গঠিত ব্যাংকের পর্ষদ দুই বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা দূর করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যাংক পরিচালকদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এ পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও ব্যাংকগুলোর পরিচালনা স্বাভাবিক রাখতে গত দুই বছরে মোট ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নথিতেও ১৪টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী সাধারণভাবে পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই বছর রাখার বিধান রয়েছে। তবে পুনর্গঠিত এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে ওই মেয়াদসংক্রান্ত বিধান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
যে কারণে আইনি বাধা কাটানো হলো
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সংশ্লিষ্ট সবার অবগতির জন্য জানানো হচ্ছে—আইনের ৪৭(২) ধারায় উল্লেখিত পরিচালনা পর্ষদ বাতিল-সংক্রান্ত মেয়াদসংক্রান্ত বিধান সব ব্যাংক-কোম্পানির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে না।
ব্যাংক-কোম্পানি আইনের ৪৭(১) ধারার আওতায় আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করতে পারে। ওই পর্ষদ বাতিলের মেয়াদ প্রয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময় সময় বাড়াতে পারে। তবে সাধারণ বিধানে বর্ধিত মেয়াদ দুই বছরের বেশি হওয়ার সুযোগ ছিল না।
পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সীমাবদ্ধতা কার্যত তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে এসব ব্যাংকের পুনর্গঠিত পর্ষদের মেয়াদ দুই বছরের বেশি সময়ও বহাল রাখতে পারবে।
১৪ ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিভিন্ন ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ অনিয়ম, খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পর একের পর এক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়।
আইএমএফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকগুলোর স্বার্থ ও আমানতকারীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করে এবং একটি ব্যাংকে পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। এসব ব্যাংকে স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদও নিয়োগ করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হয়। এর লক্ষ্য ছিল ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের প্রভাব কমিয়ে ব্যাংকগুলোকে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল করা।
এস আলম-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোতে নতুন পর্ষদ
পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি ব্যাংকও রয়েছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক পুনর্গঠিত পর্ষদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বলে আপনার দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, ব্যাংক, আমানতকারী ও জনস্বার্থে ব্যাংক-কোম্পানি আইনের ৪৫ ও ৪৭(৩) ধারার ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এস আলম পরিবারের প্রভাবাধীন পর্ষদও ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এবং স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছিল।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে ভিন্ন চিত্র
তবে পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা সব সময় বহাল থাকছে না। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুলাইয়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিদের ফিরিয়ে দেয়।
নতুন পর্ষদে ১৪ জন পরিচালক রয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান তখন জানিয়েছিলেন, ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, মালিকানা কাঠামো এবং আমানতকারীদের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সাধারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের বোর্ডের মতো নয়। ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তার সঙ্গে পর্ষদের সিদ্ধান্ত সরাসরি জড়িত।
ফলে সংকটাপন্ন ব্যাংকে পুরোনো মালিক বা পরিচালকদের সরিয়ে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করলেও অল্প সময়ের মধ্যে তাদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এখনও পুরোপুরি হয়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানে স্থিতিশীল ব্যবস্থাপনা ধরে রাখার জন্য পর্ষদের মেয়াদ নিয়ে নমনীয়তা প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তৈরি হলো।
আমানতকারীদের স্বার্থই মূল বিবেচনা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মূল লক্ষ্য হিসেবে আমানতকারীদের স্বার্থের কথা বারবার উঠে এসেছে। ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ বিলুপ্তির সময়ও বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক, আমানতকারী ও জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করেছিল।
তবে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফেরাতে শুধু পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করাই যথেষ্ট নয়। খেলাপি ঋণ আদায়, প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম বন্ধ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার এবং ব্যাংকের মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতির উন্নয়নও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনর্গঠিত পর্ষদকে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের জবাবদিহি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল নাও হতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্তে পুনর্গঠিত ১৪টি ব্যাংকের পর্ষদ নিয়ে তৈরি হওয়া দুই বছরের আইনি সীমাবদ্ধতা দূর হলো। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—এই বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকগুলোর সুশাসন ফিরিয়ে আনা, আর্থিক দুর্বলতা কাটানো এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।



