দুর্গম সীমান্তে নজরদারিতে যুক্ত হচ্ছে থার্মাল ও নাইট ভিশন ড্রোন
সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, তথ্যনির্ভর ও প্রযুক্তিসক্ষম করার লক্ষ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রতিষ্ঠিত ‘Shimanto School of Surveillance and Drone Warfare (SSSDW)’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। দেশের সীমান্ত নজরদারি ও ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারে বিশেষায়িত এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সিলেটে বিজিবি সেক্টর সদর দপ্তরে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে SSSDW-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। বিজিবি সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সিলেট অঞ্চলের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী SSSDW-এর কমপ্লেক্স ও ডিসপ্লে সেন্টার পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত কমান্ড্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীন, পিএসসি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং বিজিবিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ড্রোনের আভিযানিক প্রয়োগ ও প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা সম্পর্কে মন্ত্রীকে অবহিত করেন।
পরে প্রশিক্ষণ মাঠে বিজিবির দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ড্রোন পাইলটদের অংশগ্রহণে বিশেষ ‘ড্রোন ম্যানুভার’ মহড়া প্রদর্শন করা হয়। এতে ড্রোনের মাধ্যমে বিজিবির ছয় সদস্যের টহল দলের আভিযানিক কার্যক্রম, চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ড্রোন ব্যবহার করে চোরাকারবারীদের শনাক্ত ও আটকের মহড়া দেখানো হয়। পাশাপাশি সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ প্রতিরোধ এবং অপরিচিত বা অনুপ্রবেশকারী ড্রোন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমের ব্যবহারিক প্রয়োগও তুলে ধরা হয়।
মহড়ার শেষ পর্যায়ে বিজিবিতে সংযোজিত মাভিক ড্রোনসহ বিভিন্ন ড্রোনের সমন্বয়ে ‘ড্রোন ফ্লাই-পাস্ট’ প্রদর্শন করা হয়। এর মাধ্যমে সীমান্ত নজরদারি, চোরাচালান প্রতিরোধ, পুশ-ইন ঠেকানো এবং সার্বিক সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ড্রোন প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহারের সক্ষমতা তুলে ধরা হয়।
দুর্গম সীমান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি
উদ্বোধন শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার দুর্গম ও বনাঞ্চলবেষ্টিত এলাকাসহ সামগ্রিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও নজরদারিকে আরও কার্যকর করবে। যেখানে সরাসরি জনবল দিয়ে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন, সেখানে নাইট ভিশন ও থার্মাল প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্রোন দিয়ে ডিজিটাল নজরদারি চালানো হবে।
তিনি বলেন, থার্মাল প্রযুক্তির মাধ্যমে রাতের আঁধারেও সীমান্তের ওপারের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ এবং চোরাচালান, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের রুট শনাক্ত করে তা প্রতিহত করা সহজ হবে। সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ও মানবিক দুর্যোগেও ড্রোনের কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে বলে জানান তিনি। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান এবং দুর্গম স্থানে ত্রাণ পৌঁছে দিতে বিজিবি ড্রোন ব্যবহার করেছে বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিজিবি সদস্যদের সীমান্ত নজরদারি ও ড্রোন পরিচালনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে বেসামরিক জনবলকেও উন্নত প্রযুক্তি ও ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বিশ্বের সর্বাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ড্রোন তৈরির উদ্যোগ
সীমান্তে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি তৈরি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশে ড্রোন সংযোজন ও তৈরির কাজও চলছে। ভবিষ্যতে এ সক্ষমতা একটি প্রতিরক্ষা শিল্পে রূপ নিতে পারে। দুর্গম সীমান্তে থার্মাল ও রাতের অভিযানে সক্ষম ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার, মানব পাচার এবং অবৈধ প্রবেশ শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, SSSDW প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হলো সীমান্ত নজরদারি ও ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও সুসংহত করা। বিশেষ করে দুর্গম, বনাঞ্চলবেষ্টিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় প্রচলিত জনবলনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি আকাশভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে বিজিবির আভিযানিক সক্ষমতা আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
SSSDW-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কাঠামোর আওতায় এল। ফলে সীমান্ত নজরদারি, চোরাচালান প্রতিরোধ ও দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তা কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।



