বাঁশ-খড়-মাটিতে দেবীর অবয়ব ফুটিয়ে তুলছেন কারিগররা, বেড়েছে উপকরণের দাম
অনিল চন্দ্র রায়, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
জন্মাষ্টমীর উৎসব শেষ হতে না হতেই শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ। দুর্গাপূজার বাকি আর মাত্র ৩৯ দিন। এরই মধ্যে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদের কর্মব্যস্ততা।

সরেজমিনে উপজেলার চন্দ্রখানা পালপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পী দ্বীনেশ চন্দ্র পাল। বাঁশ, খড় ও মাটি দিয়ে নিপুণ হাতে প্রতিমার কাঠামো গড়ে তুলছেন তিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গার অবয়ব।
দ্বীনেশ চন্দ্র পাল বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের পেশা ধরে রেখেছেন। পাশাপাশি গত ১৩ বছর ধরে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তিনি। আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
মৃৎশিল্পী দ্বীনেশ চন্দ্র পাল বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও প্রায় তিন মাস আগে থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছেন তিনি। এরই মধ্যে পাঁচটি প্রতিমার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রতিটি প্রতিমা তৈরিতে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রতিমা তৈরিতে তার প্রায় ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিমা তৈরির প্রয়োজনীয় বাঁশ, খড়, মাটি, রংসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিমাগুলো ১২, ১৪ ও ১৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে কিছুটা লাভ হবে। এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে হলে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে দ্বীনেশ চন্দ্র পালের মতো উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মৃৎশিল্পীরাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ বাঁশ ও খড় দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করছেন, কেউ আবার মাটির প্রলেপ দিয়ে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তুলছেন দেব-দেবীর রূপ। পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়বে তাদের ব্যস্ততা।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী বৈষ্ণব (পূজারি) বীরেন্দ্র নাথ রায় বলেন, বাংলা ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের ২৮ আশ্বিন, ইংরেজি ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হবে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি সুনীল চন্দ্র রায় বলেন, জন্মাষ্টমীর উৎসব শেষ হওয়ার পরপরই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে দুর্গাপূজার আমেজ শুরু হয়। দুর্গাপূজার এখনো প্রায় দেড় মাস বাকি থাকলেও এরই মধ্যে বিভিন্ন মণ্ডপে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে পূজামণ্ডপের তালিকা প্রণয়ন করা হবে।
তারা জানান, গত বছর ফুলবাড়ী উপজেলায় ৭৪টি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারও প্রায় একই সংখ্যক মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছরের মতো এবারও সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
জন্মাষ্টমীর উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই ফুলবাড়ীর পালপাড়াগুলোতে তাই এখন অন্যরকম ব্যস্ততা। মৃৎশিল্পীদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় বাঁশ, খড় ও মাটির কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেবী দুর্গাসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমায়। সামনে পূজার দিন যত এগিয়ে আসবে, পালপাড়ার এই কর্মচাঞ্চল্যও তত বাড়বে।



