রাজশাহীর সাহেববাজারের স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সে চাঞ্চল্যকর স্বর্ণ চুরির ঘটনায় সাত চোর ও এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে খুলনা ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে আরএমপির মুখপাত্র কাজী মঈন উদ্দিন এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার সাত চোরের মধ্যে একজনকে খুলনা থেকে এবং ছয়জনকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই স্বর্ণ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিদুল হাসানকেও ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রবিদুল হাসান চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার সরকারবাড়ি বরণীখোলা গ্রামের রফিক উদ্দিনের ছেলে। তার হেফাজত থেকে চুরির ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রুপা এবং চোরাই স্বর্ণ বিক্রির ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ পাহারায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত ১৯ জুন ভোরে ১০ থেকে ১২ জনের একটি চোরচক্র রাজশাহীর সাহেববাজারে কারুকাজ জুয়েলার্সের সামনে আসে। তারা বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির দোকানের আড়ালে কৌশলে জটলা করে। পরে পাশের একটি স্বর্ণের দোকানের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর ওই দোকানের দেয়াল কেটে কারুশ্রী জুয়েলার্সে ঢুকে পড়ে।
চোরেরা দোকানের সিন্দুক থেকে প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ, ২ হাজার ২০০ ভরি রুপা, তিন বাক্স স্বর্ণের নাকফুল এবং নগদ ২০ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তুষার সরকার নগরীর বোয়ালিয়া থানায় মামলা করেন।
আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়জুল কবিরের নির্দেশে মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের জন্য এটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। পরে আরএমপির ডিবি, সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও সিসিটিভি ক্যামেরা ইউনিট যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
চার মাস ধরে প্রস্তুতি, হোটেলে অবস্থান করে নজরদারি
পুলিশের মুখপাত্র জানান, চক্রটির সদস্যরা অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ও কৌশলী। তারা একটি মোবাইল সিমকার্ড একবার ব্যবহার করে। সেটিও অন্য ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। ফলে ওই সিম ব্যবহারকারী সম্পর্কে নিবন্ধিত ব্যক্তিও অনেক সময় জানতেন না। চক্রের সদস্যরা নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করত এবং কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করত না।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি বছরে দু-একটি বড় ধরনের চুরি করত। চুরির আগে তারা তিন থেকে চার মাস ধরে সম্ভাব্য এলাকা ও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করত। অপরাধ সংঘটনের পর নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার পথও আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখত।
কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির প্রায় চার মাস আগে চক্রটির সদস্যরা রাজশাহীর বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নেয়। তারা ব্যবসায়ী পরিচয়ে দোকান ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে এবং চুরির জন্য উপযুক্ত সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করে।
খুলনা-ঢাকায় অভিযান, গ্রেপ্তার ৮
পুলিশ জানায়, পরবর্তী সময়ে বাগেরহাটের মোংলার শেখহাটুনিয়া মোড় এলাকার ফজলুল হকের ছেলে রুস্তম আলী শেখ (৬৪)কে খুলনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার মাধবপুরা (মাইল্যাভাঙা) গ্রামের আবদুল হাকিমের ছেলে স্বপন (৬২), ইউনুস (৪৫), মানিক ফকিরের ছেলে উজ্জ্বল (৩৭), মতিন ফকিরের ছেলে রিয়াজ সুমন সজীব ওরফে গেদু (৩৯), বাগেরহাটের শরণখোলার খোন্তাকাটা (জেমতলা) এলাকার মোসাকের ছেলে আবু তালেব (৪৫) এবং পূর্ব খোন্তাকাটার শেখ ফজলু শেখের ছেলে কালাম শেখকে (৪৮) গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই মাল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিদুল হাসানকেও ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, চুরি হওয়া বাকি স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মালামাল উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।



