তরুণরাই ই-সিগারেটসহ নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহার করছেন

বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বর্তমানে ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (এইচটিপি) ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহার করছেন। আর ২৮ দশমিক ১ শতাংশ তরুণ জীবনে অন্তত একবার এসব পণ্য ব্যবহার করেছেন। নতুন ধরনের তামাকপণ্যের মধ্যে ই-সিগারেটের ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশি তরুণদের ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচ ব্যবহার প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় ২০২৫ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত অনলাইন জরিপের মাধ্যমে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৫২৪ জন তরুণের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ এবং ২১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী ছিলেন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহারকারীদের মধ্যে ই-সিগারেট ব্যবহার করছেন ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, নিকোটিন পাউচ ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ব্যবহার করছেন শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ।

পুরুষ তরুণদের মধ্যে এসব পণ্যের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি। পুরুষ অংশগ্রহণকারীদের ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ জীবনে অন্তত একবার নতুন ধরনের তামাকপণ্যের যেকোনো একটি ব্যবহার করেছেন। নারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এ হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

প্রচলিত সিগারেটের সঙ্গে নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহারের সম্পর্কও গবেষণায় উঠে এসেছে। বর্তমানে প্রচলিত সিগারেট ব্যবহারকারী তরুণদের ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহার করছেন। বিপরীতে, যারা বর্তমানে প্রচলিত সিগারেট ব্যবহার করেন না, তাদের মধ্যে এ হার মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ।

বন্ধুদের চাপ ও বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা

গবেষণায় নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহারের বিভিন্ন কারণও উঠে এসেছে। বর্তমান ব্যবহারকারীদের ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ সামাজিক বা বন্ধুদের চাপকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রচলিত তামাকের ব্যবহার কমানো বা বিকল্প হিসেবে এসব পণ্য ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। আর ৩১ শতাংশ জানিয়েছেন, নিকোটিনের মাত্রা পছন্দ হওয়ার কারণে তারা এসব পণ্য ব্যবহার করছেন।

এসব পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন মাধ্যমের ব্যবহার দেখা গেছে। বর্তমান ব্যবহারকারীদের ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ ভেপ বা বিশেষায়িত তামাকপণ্যের দোকান থেকে পণ্য সংগ্রহ করেছেন। ৩১ শতাংশ বন্ধু বা সহকর্মীর কাছ থেকে এবং ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ অনলাইন স্টোরের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পণ্য কেনার সময় মাত্র ২৪ দশমিক ১ শতাংশ বর্তমান ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাদের বয়সের প্রমাণপত্র দেখাতে বলা হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার

তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের বিজ্ঞাপন ও বিপণনের উপস্থিতিও গবেষণায় উঠে এসেছে। অংশগ্রহণকারীদের ২৬ শতাংশ দোকান বা বিক্রয়কেন্দ্রে, ২০ দশমিক ৮ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং ১৩ দশমিক ২ শতাংশ অন্যান্য মাধ্যমে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন বা বিপণন দেখেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখার ক্ষেত্রে ফেসবুক সবচেয়ে এগিয়ে। অংশগ্রহণকারীদের ৮৯ শতাংশ ফেসবুকে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখেছেন। এরপর ইনস্টাগ্রামে ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ইউটিউবে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ বিজ্ঞাপন দেখার কথা জানিয়েছেন।

নতুন তামাকপণ্যের বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান

অনুষ্ঠানে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহির উদ্দিন স্বপন, এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান, এমপি; বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী; সিটিএফকের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামসের আঞ্চলিক পরিচালক ডা. মাহিন মালিক; শেখ মোমেনা মনি, অতিরিক্ত সচিব, বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ এবং এ এন এম মঈনুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব, হাসপাতাল অনুবিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে নীতিনির্ধারক, গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জহির উদ্দিন স্বপন, এমপি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে নিকোটিন আসক্তি থেকে সুরক্ষা দিতে নতুন ধরনের তামাকপণ্যের বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রচলিত তামাকপণ্যের পাশাপাশি ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন পণ্যের বিপণন ও সহজলভ্যতা তরুণদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষণায় উঠে আসা তথ্য নীতিনির্ধারণ ও তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি তরুণদের সুরক্ষায় এসব পণ্যের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

বিশেষ অতিথি ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান, এমপি বলেন, তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তরুণদের মধ্যে এসব পণ্যের ব্যবহার তাদের নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। নতুন ধরনের তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা ও আকর্ষণীয় বিপণন তরুণদের এসব পণ্যের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে। তাই ব্যবহার ও সহজলভ্যতা কমানোর পাশাপাশি বিজ্ঞাপন, প্রচার ও বিক্রির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, নতুন ধরনের তামাকপণ্যকে তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন ধরনের বিপণন কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব পণ্য কম ক্ষতিকর কিংবা তামাক ছাড়তে সহায়ক—এমন ধারণাও প্রচার করা হচ্ছে। গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দোকান এবং অন্যান্য মাধ্যমে এসব পণ্যের বিপণনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য সতর্কবার্তা।

তিনি বলেন, তরুণদের নিকোটিন আসক্তি থেকে রক্ষা করতে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিক্রির ক্ষেত্রে বয়স যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণায় নতুন ধরনের তামাকপণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বয়সসীমা নিশ্চিত করা, বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা এবং কর আরোপের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে বিক্রয়কেন্দ্রে পণ্যের প্রদর্শন এবং অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের প্রচার নিয়ন্ত্রণের সুপারিশও করা হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments