ফুলবাড়ীর ধরলা পাড়ে নৌকা বাইচের ফাইনাল, দর্শনার্থীর ঢল

উচ্ছ্বাসে মুখর দুই পাড়, প্রথম ‘তামিম বাংলা

অনিল চন্দ্র রায়, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে ধরলা নদীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের ফাইনাল ঘিরে উৎসবে মেতে উঠেছে পুরো এলাকা। শুক্রবার বিকেলে ফুলবাড়ী ধরলা সেতুর উত্তরে আয়োজিত ফাইনাল দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে নদীর দুই পাড় পরিণত হয় মিলনমেলায়। আয়োজকদের দাবি, ফাইনাল দেখতে প্রায় সোয়া লাখ মানুষ জড়ো হন।

স্থানীয়দের উদ্যোগে গত ২৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এ নৌকা বাইচ। এতে বিভিন্ন এলাকার ১২টি বড় নৌকা ও বাইচাল দল অংশ নেয়। ধারাবাহিক প্রতিযোগিতার পর সেমিফাইনাল শেষে শুক্রবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল।

ফাইনাল ঘিরে দুপুর থেকেই ধরলা নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল নামে

ফাইনালে উলিপুর থেকে আসা ‘তামিম বাংলা’ প্রথম স্থান অর্জন করে। দ্বিতীয় হয় ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের হক বাজার এলাকার ‘আশার আলো ভার্সন-১’ এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকার ‘দাদাভাই’।

খেলা শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ। প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় মহিষ, দ্বিতীয় পুরস্কার গরু এবং তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ছাগল। এ সময় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের এনসিপির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ফাইনাল ঘিরে দুপুর থেকেই ধরলা নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল নামে। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, কেউ নৌকায় আবার কেউ আশপাশের উঁচু জায়গায় অবস্থান নিয়ে উপভোগ করেন প্রতিযোগিতা। নৌকা বাইচ শুরু হলে দর্শনার্থীদের করতালি, উল্লাস আর চিৎকারে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ধরলা পাড়। ঢেউ কেটে প্রতিযোগী নৌকাগুলোর দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য বাড়িয়ে দেয় উত্তেজনা।

লালমনিরহাট সদর থেকে পরিবার নিয়ে খেলা দেখতে আসা চিকিৎসক খগেন্দ্র নাথ বর্মন বলেন, আগের দিনের খেলাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে ফাইনাল দেখতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছেন। দুপুর ৩টার দিকে এসে দেখেন, তখনই দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড়। সড়ক থেকে ধরলা সেতু পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানুষের ঢল নেমেছিল বলে জানান তিনি।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নৌকা বাইচের রয়েছে গভীর সম্পর্ক

নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খেলা সত্যিই আনন্দদায়ক। বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতি তাকে মুগ্ধ করেছে। লোকজ সংস্কৃতির এ ঐতিহ্য ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নৌকা বাইচ কমিটির উপদেষ্টা ও খেলা পরিচালনাকারী শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল আলম সোহেল বলেন, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খেলা। সময়ের সঙ্গে এটি অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। এ আয়োজনের মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য যেমন ফিরে আসছে, তেমনি তরুণ প্রজন্মের কাছেও নৌকা বাইচের পরিচিতি বাড়ছে।

তিনি বলেন, নৌকা বাইচসহ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে দিতে পারলে তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা সম্ভব। সেমিফাইনালসহ আগের পর্বগুলোতে প্রায় অর্ধলাখ দর্শনার্থী উপস্থিত ছিলেন। ফাইনালের দিন দুপুর থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ আসতে শুরু করেন। প্রায় সোয়া লাখ মানুষের উপস্থিতি ও উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নৌকা বাইচকে ঘিরে ধরলা নদীর পাড়ে বসে নানা ধরনের ছোট-বড় দোকানপাট। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বাড়তি বেচাকেনার সুযোগ পান। সব মিলিয়ে নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ীর ধরলা পাড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

স্থানীয়রা বলছেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নৌকা বাইচের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। একসময় দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে নিয়মিত এ আয়োজন হলেও আধুনিকতার প্রভাবে তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে ধরলা নদীতে এমন আয়োজন শুধু বিনোদনই নয়, হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্য ধরে রাখারও একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন তারা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments