আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস

আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন কতদূর? দুই বছরে নিষ্পত্তি হয়নি ১ হাজার ৬০৮ মামলা
হত্যা মামলা ৮০১, চার্জশিট ১৯৯ মামলায়; আসামি ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় গড়ে ওঠা ওই আন্দোলনের দুই বছর পূর্ণ হলেও এর মূল আকাঙ্ক্ষাগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিভিন্ন মহলে।

দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও একদলীয় শাসনের অবসানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত গুম, হত্যাকাণ্ড এবং জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা এখনও ধীরগতিতে চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও আদালত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলন ঘিরে সারাদেশে মোট ১ হাজার ৮৬২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৮০১টি। এ পর্যন্ত ২৫৪টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে ১৯৯টির অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আর ৫৫টি মামলায় অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

এখনও ১ হাজার ৬০৮টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এসব মামলায় এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা মিলিয়ে আসামি করা হয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩১ জনকে।

বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ

জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবার ও আহতদের অনেকেই বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, আন্দোলনের দুই বছর পরও অনেক ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো তদন্তে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপুলসংখ্যক আসামি, প্রত্যক্ষদর্শীর অভাব, ভিডিও ফুটেজ ও ডিজিটাল তথ্য যাচাই এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক মামলায় সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে সময় লাগছে।

এ ছাড়া কিছু মামলায় মৃত বা বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের আসামি করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এতে মামলাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তদন্তে চার চ্যালেঞ্জ

জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো তদন্তে প্রধান চারটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তদন্তকারীদের।

প্রথমত, অনেক মামলায় পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়া বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কিছু মামলায় কাল্পনিক পরিচয় বা মৃত ব্যক্তিদের আসামি করার অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয়ত, সাক্ষীরা আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার পর ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়ছেন। চতুর্থত, কিছু শহীদ পরিবারের সদস্যরা আইনি জটিলতা ও ব্যক্তিগত কারণে মামলা করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীন করতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

‘কিছুই বদলায়নি’—ফখরুল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় হতাশা প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, “আমি দেখছি, কিছুই বদলায়নি।”

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, আগে যারা দুর্নীতি করত, তারা এখনও দুর্নীতির পথ খুঁজছে। যারা ভালো কাজ আটকে দিত, তারাও এখনও একই কাজ করছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণ ভোট পরিবর্তন চায়। কিন্তু যারা জুলাইয়ের চেতনার কথা বলছেন, তাদের অনেকেই এখন সেই চেতনার বিপরীত আচরণ করছেন।

৫৯ মামলার তদন্ত করছে ডিবি

জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ৫৯টি মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামি থাকায় তাদের অবস্থান, ভূমিকা ও ফরেনসিক তথ্য যাচাই করে ধাপে ধাপে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। আন্দোলনের প্রায় ৪০ জিবি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

আজ দেশের ৬৪ জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। সকাল ৯টায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দুপুর ১২টায় রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং দিবসের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

দিবস উপলক্ষে দেশের সরকারি ও বেসরকারি জাদুঘরগুলো বিনা টিকিটে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। শিশুদের জন্য বিনোদনমূলক স্থানগুলোতেও বিনা টিকিটে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, শিশু পরিবার, পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments