ইতালিতে স্বপ্নের সংসারে নৃশংস পরিণতি, স্ত্রী-কন্যাসহ বাবুলের দাফন সম্পন্ন

হত্যার ১ মাস ১৯ দিনেও গ্রেপ্তার হয়নি প্রধান সন্দেহভাজন শাহাদাত

ইতালির রাজধানী রোমে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের একই পরিবারের তিন বাংলাদেশির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বাদ মাগরিব উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়।

তবে মর্মান্তিক এ হত্যাকাণ্ডের ১ মাস ১৯ দিন পার হলেও প্রধান সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেন এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা।

নিহতরা হলেন—চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তাঁর স্ত্রী (৩৮) ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশা। একই ঘটনায় গুরুতর আহত তাঁদের একমাত্র ছেলে অয়নও শুক্রবার দেশে ফিরে জানাজা ও দাফনে অংশ নেন।

শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিহত তিনজনের মরদেহ পৌঁছায়। পরে স্বজনরা মরদেহগুলো গ্রামের বাড়ি কোম্পানীগঞ্জে নিয়ে যান।

রোমের বাসায় ছুরিকাঘাতে তিনজনকে হত্যা

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জুন রাতে ইতালির রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিলিওর একটি অ্যাপার্টমেন্টে ছুরিকাঘাতে বাবুল, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে নিহত হন।

প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। একই সময় গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁদের ছেলে অয়নকে উদ্ধার করে স্থানীয় জেমেলি পলিক্লিনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

গত ১১ আগস্ট ইতালির স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রোমের ক্যাসালোত্তি এলাকার পিয়াজ্জা ওর্মেয়ায় নিহত তিনজনের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁদের মরদেহ বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠানো হয়।

প্রধান সন্দেহভাজন শাহাদাত এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডে মো. শাহাদাত হোসেনকে (৪০) প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করেছে ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত ২৭ জুন তাঁর ছবি প্রকাশ করে তাঁকে শনাক্তে সহযোগিতা চাওয়া হয়।

ইতালীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ছবিতে থাকা ব্যক্তিকে রোমের ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাঁর বয়স ও জাতীয় পরিচয় উল্লেখ করে তাঁর বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে রোম কোয়েস্টের মোবাইল টিমে জানাতে অনুরোধ করা হয়।

শাহাদাত নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব এবং চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল আহাদের ছেলে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

‘বাবুল সবার সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিশতেন’

নিহত বাবুলের চাচাতো ভাই অ্যাডভোকেট ইউনুস বলেন, ইতালিতে থাকা স্বজনদের মাধ্যমে তাঁরা হত্যাকাণ্ডের খবর জানতে পারেন। পাঁচ বোনের মধ্যে বাবুল ছিলেন একমাত্র ভাই। দেশে এলে তিনি সবার সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিশতেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন।

তিনি বলেন, “এমন নির্মম ঘটনায় আমরা বাকরুদ্ধ। হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন শাহাদাতকে এখনো আইনের আওতায় না আনায় আমরা বিস্মিত। আমরা চাই দ্রুত তাঁকে গ্রেপ্তার করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হোক।”

হত্যার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত

এদিকে হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটনে ইতালির পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে।

তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

হত্যার আগে মিলেছিল হুমকির চিঠি

এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের আগে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে তাঁদের বাড়ির সামনে ‘লাল বাহিনী’ নামের একটি কথিত ডাকাত দলের নামে একটি উড়ো চিঠি পাওয়া যায়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২ জুলাই চরকাঁকড়া ইউনিয়নে তাঁদের বাড়ির সামনে ওই চিঠি পাওয়া যায়। এতে পরিবারের কাছে টাকা ও স্বর্ণালংকার দাবি করা হয়েছিল। দাবি পূরণ না করলে ছেলে-নাতিকে হত্যাসহ পরিবারের নারী সদস্যদের ওপর নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন স্বজনরা।

পরে নিরাপত্তাশঙ্কার কথা জানিয়ে নিহতের বাবা সিরাজুল ইসলাম কোম্পানীগঞ্জ থানায় এবং স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন বলে জানা গেছে।

তবে ওই হুমকির চিঠির সঙ্গে ইতালিতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

‘আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে, আমি বিচার চাই’

নিহত বাবুলের বাবা সিরাজুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলে দেশে ছুটিতে এসে কবরস্থানে মাটি ফেলেছে। সেখানেই তাকে স্ত্রী-সন্তানসহ দাফন দেওয়া হলো। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমি বিচার চাই।”

স্বামী, স্ত্রী ও পাঁচ বছরের শিশুকন্যাকে একসঙ্গে হারিয়ে শোকে কাতর পরিবার। একমাত্র ছেলে অয়ন গুরুতর আহত হয়ে দেশে ফিরেছেন। এখন পরিবারের একমাত্র দাবি—ইতালিতে দ্রুত তদন্ত শেষ করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments