অবস্থান জানতে ইন্টারপোলে পুলিশের চিঠি
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ এখন কোথায়—এ নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ের আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর প্রকাশ্যে তাকে দেখা যায়নি। গণমাধ্যমে তিনি ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে খবর প্রকাশ হলেও এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ অবস্থায় তার বর্তমান অবস্থান জানতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।
গত বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থেকে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে ই-মেইল পাঠিয়ে বেনজীর আহমেদের বর্তমান অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছে।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বুধবার ইন্টারপোলের কাছে একটি ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। এতে সাবেক আইজিপি বেনজীরের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে তিনি অন্য কোথাও চলে গেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্যই ইন্টারপোলের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। উত্তর পেলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
সেন্ট লুসিয়ায় যাওয়ার খবর
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুলাই কারামুক্তির পর ১৭ আগস্ট দুবাই থেকে সেন্ট লুসিয়ায় যান বেনজীর আহমেদ। দেশটির পাসপোর্ট তার রয়েছে এবং সেখানে তার যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেন্ট লুসিয়ার গ্রস আইলেট এলাকায় তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তবে কোনো পক্ষ থেকেই এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত নথি ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত শর্তসাপেক্ষে তাকে জামিন দেন। একাধিক সূত্রের দাবি, জামিনের শর্ত হিসেবে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ কোটি টাকা দিতে হয়েছে তাকে।
দুবাইয়ের আদালত থেকে বেনজীরের জামিন ও কারামুক্তির খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তৎপরতা শুরু করে। তাৎক্ষণিকভাবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগের কথা জানানো হয়। তবে সেই আইনজীবীর কাছ থেকেও বেনজীরের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।
ঢাকায় অবস্থানরত বেনজীরের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি ইত্তেফাককে জানান, সর্বশেষ কয়েক দিন আগে বেনজীর আহমেদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল। তখন তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছিলেন। এরপর তিনি অন্য কোথাও গেছেন কি না, সে বিষয়ে ওই ব্যক্তি কিছু জানেন না। সম্প্রতি বেনজীরকে মেসেজ পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
ইউএইর আইন কী বলে?
সংযুক্ত আরব আমিরাতে জামিন পেলেই কোনো বন্দি সাধারণত অন্য দেশে যেতে পারেন না। দেশটির ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, জামিনের সঙ্গে কিছু বাধ্যতামূলক আইনি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম ইমিগ্রেশন ও বিমানবন্দরগুলোতে ব্লক করে দেওয়া হয়, যাতে তিনি দেশত্যাগ করতে না পারেন।
জামিনের অন্যতম শর্ত হিসেবে বন্দির পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে অথবা পাবলিক প্রসিকিউশনের কাছে জমা রাখা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল অভিযুক্তের পাসপোর্ট না থাকলে তার জামিনদারের পাসপোর্ট বা আর্থিক গ্যারান্টি জমা দিতে হয়। ফলে পাসপোর্ট ছাড়া অন্য কোনো দেশে ভ্রমণ আইনত সম্ভব নয়।
দুবাইয়ের বিচারব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তি যাতে তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি শুনানিতে সশরীরে উপস্থিত থাকেন। জামিন পাওয়ার অর্থ মামলা শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং কারাগারের বাইরে থেকে আইনি লড়াই করার সুযোগ পাওয়া। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকতে পারে।
তবে জরুরি মানবিক বা চিকিৎসার প্রয়োজনে অন্য দেশে যাওয়ার প্রয়োজন হলে আদালতে যথাযথ তথ্য-প্রমাণসহ বিশেষ আবেদন করতে হয়। আদালত সন্তুষ্ট হলে সাময়িকভাবে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে পাসপোর্ট ফেরত দিতে পারে। গুরুতর অপরাধ বা আর্থিক জালিয়াতির মামলায় এমন অনুমতি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
অবৈধ সম্পদ, অর্থ পাচারের অনুসন্ধান
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একাধিক মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগগুলোর তদন্তের অংশ হিসেবে দেশে-বিদেশে তার সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। তদন্ত চলাকালে তিনি দেশত্যাগ করেন। পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের এবং আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের বর্তমান ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে দুদক আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, সম্পদ জব্দের উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ সরকার ইন্টারপোলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বেনজীরের প্রত্যর্পণ চায়। এ জন্য দুদকের প্রস্তুত করা প্রায় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠানো হয়। নথিতে তার বিরুদ্ধে দেশে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার তথ্য ও প্রত্যর্পণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করা হয়।
এখন ইন্টারপোলের কাছ থেকে বেনজীর আহমেদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।



