হাম বজ্র্যপাতের মতো আমাদের উপর এসে পড়েছে। এ নিয়ে আমাদের কোন ধরনের প্রস্ততি ছিল না। আমাদের অনেকগুলো বাচ্চা অকালে ঝরে গেছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে অত্যন্ত মর্মাহত; আমি খুব ব্যথিত হয়েছি। তবে হাম মোকাবিলায় সরকার এখন পুরোপুরি প্রস্তত বলে জানিয়েছেনর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরতার মো. এম সাখাওয়াত হোসেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শিশু হাসপাতালে হামজনিত নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপের ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, আগামী রবিবার তেকে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া গুরু হবে। ৬ মাস বয়স থেকে ১০ বছরের শিশুরা এই টিকা পাবে। ঢাকা ও রাজশাহীসহ সারাদেশে হামের প্রদূর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই সংকটময় সুহুর্তে তিনি স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে থাকার অনুরোধ জানান।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস), বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট (বিএসএইচআই) এবং আইসিডিডিআর,বি-র সহযোগিতায় হামজনিত নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপের ব্যবহারের ওপর দেশব্যাপী হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের প্রথম ধাপ শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে সারাদেশে বাবল সিপ্যাপ ব্যবহারের সম্প্রসারণ করা।
আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, আইসিডিডিআর,বি-র বাবল সিপ্যাপ ব্যবহার করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে অনেক ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হয় না।
এছাড়াও, তিনি উল্লেখ করেন যে ২০১৩ সালের আগস্ট থেকে আইসিডিডিআর,বি-র ঢাকা হাসপাতালে তীব্র নিউমোনিয়া ও হাইপোক্সেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপ নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বর্তমানে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশেও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, বাবল সিপ্যাপের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করা হলে তিনি এই বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে এর প্রচারের নির্দেশ দেন। তিনি হামের পুনরায় প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা ও শিশুদের সুরক্ষায় বিভিন্ন খাতের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান এবং মন্ত্রণালয়কে আইসিডিডিআর,বি-র সক্রিয় কারিগরি সহায়তার প্রশংসা করেন।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক বলেন, আইসিডিডিআর,বি স্বল্পমূল্যের ও কার্যকর বাবল সিপ্যাপ অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছে, যা নিউমোনিয়া জনিত মৃত্যুহার কমানোর পাশাপাশি অক্সিজেন ব্যবহারের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত লো-ফ্লো অক্সিজেন থেরাপির তুলনায় বাবল সিপ্যাপ শিশুদের জীবন রক্ষায় বেশি কার্যকর এবং দেশব্যাপী এর ব্যবহার সম্প্রসারণের এখনই উপযুক্ত সময়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিএসএইচআই পরিচালনা বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, শিশু সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম প্রমুখ।
আইসিডিডিআর,বি-র সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডা. মুহাম্মদ যোবায়ের চিশতী ও তার সহকর্মীরা বাবল সিপ্যাপ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট, ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল, আইসিএমএইচ মাতুয়াইল, সংক্রামক রোগ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা অংশগ্রহণ করেন।
শিশু হাসপাতালে নতুন বহির্বিভাগ ইউনিট উদ্বোধন করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীঃ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নতুন বহির্বিভাগ (আউটপেশেন্ট) ইউনিট চালু করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নতুন এই ইউনিটের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি হাসপাতালটিতে এই বহির্বিভাগ ইউনিটটি নির্মাণ করেছে। নতুন এই ইউনিট চালু হওয়ায় চিকিৎসা সেবার পরিধি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত রোগীদের সেবাপ্রাপ্তি আরও সহজ হবে।
বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রাব্বুর রেজা বলেন, আমাদের এসব উদ্যোগ সিএসআর কর্মসূচির অংশ হিসেবে জনস্বাস্থ্য চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে, বিশেষ করে জাতীয় সংকটের সময়ে এটা খুবই জরুরি। বর্তমানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। শিশুদের মধ্যে হঠাৎ করেই সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বেশ কয়েকজন শিশুমৃত্যুর ঘটনা গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ঃ মহাকালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহান গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে হাম বিষয়ে গত ২৪ ঘন্টার আপডেট তথ্যে বলেন, চলতি বছর জানুয়ারি মাস থেখে এখন পর্যন্ত আমাদের এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছেল ৬৭৪ জন।
এরমধ্যে হাম সন্দেহে মৃত্যু হয়েছে ২৭ জনের। এ পর্যন্ত সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫৬৪ জন। গত ২৪ ঘন্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১ জন, ভর্তি আছে ৮১ শিশু।
ডা. তানজিনা বলেন, অন্য হাসপাতালে একহাজার বেডের বিপরীতে যেমন পাঁচ হাজার রোগী রাখা যায়, সেটা আমার এই হাসপাতালে করা যায় না। কারণে আমি চাইলেই এইচআইভি রোগীর পাশে হাম রাখতে পারি না, তেমনি টিটেনাসের রোগীর পাশে কিংবা এসকে ফালাইটিস এর পাশে হাম রাখতে পারি না।
আমার এই হাসপাতালে ১০টা বেড় আছে হামের জন্যে। উপরের নিদেশর্না অনুযায়ি এক বছরের বেশি শিশুদের ডিএসসিসি কোভিড-১৯ হাসপাতালে পাঠাচ্ছি, আর এক বছরের নীচের শিশুদের এখানে রাখছি।


