প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয় ধ্বংসস্তূপ

বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ধ্বংসন্তূপে পরিণত হয়েছে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার প্রতিকার প্রধান কার্যালয়। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পোড়া ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভবন দুটিতে ভেসে উঠছে হামলার ভয়াবহতা। হামলার সময় গত বৃহস্পতিবার রাতে ডেইলি স্টার ভবনের সামনে হেনস্থার শিকার হয়েছেন ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর।

পরিস্থিতি আতঙ্কিত করে তুলেছে দেশের পুরো গণমাধ্যমকে। এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ১০ দেশ। এছাড়াও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে’র এশিয়া শাখা), বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতারা।

হামলার ঘটনায় দেশ-বিদেশে সমালোচনায় ঝড় বইছে। প্রধান উপদেষ্টা দুটি পত্রিকায় সম্পাদককে ফোন করে দুংখ প্রকাশ করেছেন। ইতিমধ্যে হামলার সঙ্গে সম্পৃক্তদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে শুক্রবার সকাল থেকেই প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ের সামনে ভীড় করে উৎসুক জনতা। ভবন দুটির সামনে দাঁড়িয়ে আতকে উঠছেন অগ্নিসংযোগের সময় ভেতরে অবরুদ্ধ থাকা গণমাধ্যম দুটির কর্মীরা। কেউ কেউ বেঁচে ফেরার স্মৃতি বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মোতায়েন রাখা হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত ফোর্স। ক্ষতিগ্রস্থ প্রথম আলোর ভবন পরিদর্শন করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ক্রাইম সিন ইউনিট। হামলাকারীদের চিহ্নিত করে এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে পরিকল্পিতভাবে একটি মহল এ হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে প্রথম আলোর সংশ্লিষ্টরা।

সরজমিন দেখা যায়, কারওয়ান বাজারে প্রগতি ইন্সুরেন্স ভবনের পাশে ১৯ নম্বর ৪ তলা বিশিষ্ট প্রথম আলো ভবনের ভেতরে কিছুই অবশিষ্ট নেই। নিচতলার প্রথমা প্রকাশনীর সাটার ভেঙে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। ২য় তলায় ছিল বিজ্ঞাপন বিভাগ। ৩য় তলায় একাউন্টস বিভাগ এবং ৪ তলায় ওটিটি প্লাটফর্ম চরকির অফিস। বাইরে দাঁড়িয়েই বোঝা যায়- সবগুলো ফ্লোরের ভেতরে আগুনে পোড়া চেয়ার টেবিল, সোফা, ভাঙা কাচের টুকরো, বই, বিভিন্ন নথিপত্র পড়ে আছে।

ভবনের সামনে ইটপাটকেল ও পানি জমে আছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করতে দেখা যায় সিআইডি’র ক্রাইম সিন ইউনিটকে। দুপুরে আইজিপি বাহারুল আলম প্রথম আলো ভবনটি পরিদর্শনকালে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তার কাছে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা শোনেন।

গতকাল শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে প্রথম আলোর ভবনের সামনে কথা হয় ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজানের সঙ্গে।

তিনি বলেন, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দুটি ভবনের সামনেই অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন আছে। এখনো গণমাধ্যম দুটির পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি।

ডেইলি স্টার ভবনের সামনে গিয়েও দেখা যায় উৎসুক জনতার ভীড়। ভবনের সামনে পুলিশ বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যরা মোতায়েন রয়েছে। তবে ভবনের ভেতরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বাইরে থেকে দেখা যায়, নিচতলা ও ২য় তলার সবকিছু পুড়ে ছাঁই হয়ে গেছে গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা জানান, ভবনের ৩য় তলা পর্যন্ত আগুনে পুড়েছে। ৭ম তলা পর্যন্ত ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। ভবনটির ১ম ও ২য় তলা জুলাই অভুত্থানের ফটো গ্যালারি, ৩য় তলায় গোদাম, ৪র্থ তলায় ক্যান্টিন ও নামাজের ঘর, ৫ম তলায় একাউন্টস, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগ, ৬ষ্ঠ তলায় রিপোর্টিং বিভাগ। এছাড়াও ৭ম তলা পর্যন্ত বিভিন্ন ফ্লোরে সেমিনার কক্ষসহ ফটো সেকশন ছিল।

এসব ফ্লোর থেকে হামলাকারীরা যে যা পেয়েছে লুটপাট করে নিয়ে গেছে। তছনছ করা হয়েছে কাগজপত্র, কম্পিউটার, আসবাবসহ অফিসের বিভিন্ন উপকরণ। দুপুরে কর্মস্থলের সামনে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন ডেইলি স্টারের ফটো সাংবাদিক প্রবীর দাশ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার এত বছরের ক্যারিয়ারে তোলা ছবি সম্বলিত চার-পাঁচটি হার্ডড্রাইভ খুইয়ে ফেললাম। অগ্নিসংযোগকারীরা হয়তো জানে না, একজন সাংবাদিকের কাছে এসব জিনিসের মূল্য কতটা।

ডেইলি স্টারের সামনে দায়িত্বরত ডিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, পর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

অপরদিকে প্রথম আলোর অফিসে আগুন নেভানোর সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে আহত দুই ফায়ার ফাইটারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা হলেন- মো. আলমগীর হোসেন ও মো. শফিউল আলম।

প্রথম আলোর কর্মীদের মানববন্ধন
হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রথম আলোর কর্মীরা। বিকেলে কার্যালয়ের সামনে ‘প্রথম আলোর ওপর আক্রমণের প্রতিবাদ’ লেখা ব্যানার হাতে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে অংশ নেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকসহ সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শরিফ ওসমান হাদির দুঃখজনক হত্যাকাÐের ঘটনাকে পুঁজি করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে এসব আক্রমণের ঘটনা ঘটিয়েছে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য এ ছিল একটি কালো দিন। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, গত ২৭ বছরে এই প্রথম আজকে আমাদের পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। পত্রিকার অনলাইন ভার্সনও বন্ধ রয়েছে। প্রথম আলোর ওপরে হামলাকে আমরা বাংলাদেশের বাক্স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপরে কঠিন আক্রমণ হিসেবেই দেখছি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে নস্যাৎ ও ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য এবং আগামী নির্বাচনকে পথভ্রষ্ট করার জন্য এই হামলা চালানো হয়েছে। মানববন্ধন কর্মসূচিতে সাজ্জাদ শরিফ বক্তব্য দেওয়ার সময় কয়েকজন ব্যক্তি হট্টগোল শুরু করেন। তারা প্রথম আলোর উদ্দেশ্যে গালিগালাজ করেন। এ পরিস্থিতিতে কর্মসূচি দ্রæত শেষ করে প্রথম আলোর কর্মীরা বিক্ষোভস্থল থেকে চলে যান। পরে পুলিশ হট্টগোলকারীদের কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজারের দিকে সরিয়ে দেয়।

এনসিপির আহবায়ক যা বলেন
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে আগুনের ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহŸায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, শরিফ ওসমান হাদির লড়াই প্রতিষ্ঠান গড়ার লড়াই। গঠনতান্ত্রিক লড়াই। আধিপত্যবাদ ভেঙে বাংলাদেশ গড়ার লড়াই। যারা আজকে আগুন দিয়ে আন্দোলন ও বিক্ষোভকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং এ কর্মসূচিকে উৎসাহ দিয়েছে, তারা হাদির স্পিরিটের বিরোধী।

এটা পরিকল্পিত স্যাবোটেজ। সবাই শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন গড়ে তুলুন। হাদির শহীদি মৃত্যুকে আমরা কোনোভাবেই কোনো হঠকারী গ্রæপকে ব্যবহার করতে দিবো না। হাদির খুনি ও গণহত্যাকারী হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত দিতে হবে।

বিএফইউজে ও ডিইউজে সহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্বেগ, প্রতিবাদের ঝড়
গণমাধ্যম দুটিতে হামলা ও অগ্নিসংযোগে গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠন। শুক্রবার বিএফইউজে সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী এবং ডিইউজে সভাপতি মো শহিদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম এক যুক্ত বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, গণমাধ্যমের ওপর হামলা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

কারণ, গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরে কখনো আইনের শাসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ ধরনের হামলা সুস্থ রাজনীতির অন্তরায় উল্লেখ করে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বলেন, বিএফইউজে ও ডিইউজে শুরু থেকেই স্বাধীন মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য লড়াই করে আসছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা মনে করি, পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে এই ন্যাক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছ।

বিশেষ করে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক সর্বজন শ্রদ্ধেয় নূরুল কবিরের ওপর হমলা একটি বিশেষ মহলের সুপরিকল্পিত এজেÐা বলেই আমরা মনে করি। নেতৃবৃন্দ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দাবি জানানো হয়।

নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ১০টি দেশ। মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশনের বিবৃতিতে সাক্ষর করেছে কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য। যুক্তরাষ্ট্র এই কোয়ালিশনের সদস্য হলেও বিবৃতিতে তাদের সই নেই।

বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা সব গণমাধ্যম পেশাজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দ্রæত ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহŸান জানাচ্ছি, যাতে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। সাংবাদিকদের নির্ভয়ে তাদের কাজ করতে সক্ষম হতে হবে। আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং একটি উন্মুক্ত, সচেতন সমাজ সমুন্নত রাখার জন্য তাদের রক্ষা করা অপরিহার্য।

এছাড়া গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি), মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশন (এমএফসি), ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ডিক্যাব), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা), জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল।

উল্লেখ্য ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে একদল বিক্ষুব্ধ লোক প্রথমে প্রথম আলোতে এবং পরে ডেইলি স্টারে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় গণমাধ্যম দুটির বেশ কয়েকজন কর্মী ভেতরে আটকা পড়ে এবং আগুনের ধোঁয়ায় দম আটকে আসায় বাঁচার আকুতি জানায়। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহযোগীতায় তাদের উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments