কথা রাখতে পারলো না জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। নতুন শিক্ষাবর্ষের ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো মাধ্যমিকের এক কোটির বেশি পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলায় বই ছাড়াই ক্লাস চলছে। গত ২৮ ডিসেম্বর এনসিটিবির কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার জানিয়েছিলেন, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সব বই দেওয়া হবে। এখন সব শিক্ষার্থীর কাছে বই পৌঁছে দিতে আরো ১৫ দিন সময় চেয়েছে এনসিটিবি।
এদিকে শেষ সময়ে এসে তাড়াহুড়া করে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপিয়ে সরকারি বিপুল অর্থ আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে শতাধিক ছাপাখানার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি মাধ্যমিকের ২৫ লাখ নি¤œমানের পাঠ্যবই কেটে বিনষ্ট করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ইন্সপেকশন কোম্পানি। এর আগে ৬৭ ছাপাখানার ১৭ লাখের বেশি প্রাথমিকের পাঠ্যবই বাতিল করে কেটে দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে চলতি শিক্ষাবর্ষের নি¤œমানের ৪২ লাখ পাঠ্যবই বাতিল হলো।
এনসিটিবি, ইন্সপেকশন কোম্পানির পাশাপাশি ‘মিনিস্ট্রি টিম’ সব ছাপাখানা পরিদর্শনে গিয়ে এসব নি¤œমানের পাঠ্যবই হাতেনাতে শনাক্ত করে।
নতুন বই হাতে পেতে যত দেরি হবে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতিও তত বাড়বে। এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলেন, যথাসময়ে বই দিতে প্রিন্টার্সগুলোকে তাগাদা দিচ্ছেন তারা। কর্মকর্তাদের দাবি, গত দেড় দশকে জানুয়ারির কখনোই শতভাগ বই পৌঁছানো যায়নি। কখনো কখনো মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগেছে। সেই অর্থে এবার ৩০ জানুয়ারির মধ্যে সব বই শিক্ষার্থীদের দেওয়া হলে, তা হবে এনসিটিবির জন্য নতুন মাইলফলক।
নতুন বছরে নতুন ক্লাসে নতুন বই শিশুদের কাছে আনন্দের যেন কোনো সীমা থাকে না। সুন্দর নতুন বই পাওয়ার আনন্দ শিশুদের পাঠের উৎসাহ বাড়িয়ে দেয়। তারা সে বই শুঁকে দেখে, বুকে জড়িয়ে ধরে। এ জন্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শিশুদের বইগুলো হয় ভালো কাগজে ছাপা সুন্দর, রঙিন ও আকর্ষণীয়। কিন্তু ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। গত ১৬ বছর ধরে নি¤œমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপিয়ে আসছে শত শত কোটি টাকা আতœসাৎ করেছে দেশের অনেক ছাপাখানা।
অনেক ছাপাখানার মালিক দম্ভের সঙ্গে নি¤œমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপানোর কথা স্বীকারও করেছেন। একটি অডিও রেকর্ডে জনতা প্রেসের মালিক নজরুল ইসলাম কাজলের মুখ থেকে বলতে শোনা যায়, ‘এক যুগ ধরে সব ছাপাখানা নি¤œমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপিয়েছে, আমিও ছাপিয়েছি।’ এভাবে নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপিয়ে আওয়ামী সরকারের গত দেড় যুগে লুটপাট করা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।
জানা গেছে, অতীতে নজরুল ইসলাম কাজলের পাঠ্যবইয়ের ৯০ ভাগই নিম্নমানের কাগজে ছাপানো ছিল। এ ব্যাপারে নজরুল ইসলাম কাজলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। কাজলের প্রতিষ্ঠানের নি¤œমানের পাঠ্যবই এবারও কাটা হয়েছে। জানা গেছে, এবার এনসিটিবি পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে আপোষ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কারণে নি¤œমান হলেই বই কেটে ফেলা হচ্ছে।
এনসিটিবি মাধ্যমিকের পাঠ্যবই মনিটরিংয়ের সঙ্গে জড়িত প্রি-ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্ট কন্ট্রোল ইউনিয়ন বিডি-এর প্রকল্প পরিচালক রাফি মাহমুদ বিপ্লব বলেন, টেন্ডারের শর্তানুযায়ী মান পাওয়া না গেলেই ওইসব বই জব্দ করা হচ্ছে। ছাপা, কাটিং ও বাঁধাই পর্যায়ে বিভিন্ন ত্রুটির কারণে এসব বই বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে ৩ হাজার টন মুদ্রণ কাগজ বাতিল করে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান থেকে অপসারণ করেছি।
এছাড়া ও ৪৫ লাখ মুদ্রিত ফর্মা ও ২৫ লাখ রেডি বই বিভিন্ন সমায় বিভিন্ন প্রেস হতে বাতিল করে বিনষ্ট করেছি। মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক সরবারহ নিশ্চিতে মানে কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে ২৪ ঘন্টা আলাদা আলাদা টিম দিয়ে প্রেস মনিটরিংয়ের পাশাপাশি নানান পদক্ষেপ নিয়েছি।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, ছাপাখানার মালিকরা এতটাই কৌশলী যে, তারা একেবারে শেষ মুহূর্তে চুক্তি করে থাকে। যাতে শেষ সময়ে সময় স্বল্পতায় তাড়াহুড়ার মধ্যে যথেচ্ছভাবে নিম্নমানের বই ছাপিয়ে সরবরাহ করতে পারে। অতীতে তারা এমন নয়ছয় করে সরকারের অর্থ আত্মসাৎ করে। এ নিয়ে এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি।
এনসিটিবি প্রাথমিকের বই প্রি-ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্ট ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন বিডি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজীম মুনির বলেন, বিভিন্ন অনিয়ম ও ত্রুটির কারণে সব মিলিয়ে এবার প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়ের আড়াই কোটি ফর্ম কাটা হয়েছে। ফর্মা মিসিং, ডাবল ফর্মা, আলট্রা ভার্নিশ না করা, বাঁধাইয়ে ত্রুটিসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৬৭ ছাপাখানার ১৭ লাখের বেশি বই বাতিল করা হয়েছে। কাজ পাওয়া অধিকাংশ ছাপাখানাই এই অনিয়মে জড়িত। নিম্নমানের কাগজকে ভালো মান করতে মুনিরকে অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করতে চেয়েছিল অর্ধ শতাধিক ছাপাখানার মালিক।
যেভাবে নি¤œমানের কাগজ সংগ্রহ করে ছাপাখানার মালিকরা: অনুসন্ধানে জানা গেছে, এনসিটিবি’র বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহের মূল হোতা বিসমিল্লাহ পেপার হাউসের মালিক মিন্টু মোল্লা। ১১৬ ছাপাখানার মধ্যে একশ’র বেশি ছাপাখানা নিম্নমানের কাগজ মিন্টুর কাছ থেকে ক্রয় করেন।
নিম্নমানের কাগজকে সঠিক মান হিসেবে অনুমোদন করিয়ে দেওয়ার জন্য ছাপাখানাগুলোর কাছ থেকে টন প্রতি কাগজের মূল্য পাঁচ হাজার টাকা বেশি নেন। প্রতি বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যবই ছাপাতে এক লাখ টনের বেশি কাগজ লাগে। দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন মিন্টু।
শুধু তাই নয়, এনসিটিবির পাঠ্যবই ছাপাতে দুটি ছাপাখানার মালিকও হয়েছেন মিন্টু মোল্লা। তার ছাপাখানা দুটি হলো মোল্লা প্রেস এন্ড পাবলিকেশন এবং অটো প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং। অতীতে তার পাঠ্যবইয়ের ৮০ ভাগই নিম্নমানের কাগজে ছাপানো ছিল। ছাপার রঙ এবং বাঁধাইও নিম্নমান।
এ কারণে শিক্ষাবর্ষের তিন মাস না যেতেই বইয়ের পৃষ্ঠা ছিড়ে গেছে, খুলে গেছে বাঁধাই। এ ব্যাপারে মিন্টু মোল্লা ইত্তেফাককে বলেন, তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ মিথ্যা। তিনি নি¤œমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপেন না। নি¤œমানের কাগজ সরবরাহ করেননি বলে তিনি দাবি করেন।
এনসিটিবি সূত্রমতে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৩০ কোটি ২ লাখের বেশি। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরে (ইবতেদায়িসহ) মোট পাঠ্যবই ২১ কোটি ৪৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৪ কপি।
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, দুর্নীতিবাজ ছাপাখানার মালিকরা বিগত বছরগুলোয় নিম্নমানের বই সরবরাহ করেছে। চক্রটি এখনো সক্রিয়। তারা এ বছরও নিম্নমানের বই সরবরাহ করছে বলে আমরা জেনেছি। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাহলে পরবর্তী বছরগুলোতে আর কেউ নিম্নমানের বই দিতে সাহস পাবে না।



