মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ভোট কেনাবেচার নীল নকশা

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে ভোট কেনাবেচার নীল নকশা করছে কোনো কোনো দল ও প্রার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে-একটি সংগঠিত দল ঘরে ঘরে গিয়ে বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করছে, যা ভোটের আগে অর্থ লেনদেনের প্রস্তুতির বড় ধরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রতিদিন শত শত ভিডিও ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও এ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

অথচ এসব অভিযোগ ও দৃশ্যমান প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না, যা ভোটের নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যদিও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতের ভোটের আগে ৪৮ ঘন্টা সবধরণের মোবাইল ব্য্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলো ইসি। তবে এখনো পর্যন্ত ইসি থেকে এ বিষয়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ভোট কেনাচেবার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলিম বলেন, এটি নির্বাচনে বড় ধরণের প্রভাব পড়বে। ভোট যে কেনাবেচা হয়, এটি অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশের একশ্রেনীর মানুষ ভোট কেনাবেচায় জড়িত। তবে এদের ধরাও কঠিন। তিনি মনে করেন তিন প্রক্রিয়ায় এটি ঠেকানো সম্ভব।

এর মধ্যে প্রথম হলো মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রমে যারা জড়িত সেই সব প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা, ভোটের সময় সাময়িক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ রাখা এবং ইসি সতর্ককরণ প্রচারণা চালিয়ে ভোটারদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে এমএফএস লেনদেন বন্ধ, প্রার্থী, দল এবং সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস হিসাব নির্বাচনকালীন বিশেষ নজরদারিতে আনা, ভোট কেনাবেচায় প্রমাণ মিললে প্রার্থিতা তাৎক্ষণিক বাতিলসহ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে নির্বাচন সুষ্ঠু সম্ভব হবে না।
আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে-নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি এড়াতে এবার বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভোট কেনাবেচা সহজ ও দ্রুত হতে পারে।

ফলে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, আশঙ্কাও তত বাড়ছে। গত মঙ্গলবার মিরপুরে এ নিয়ে সংর্ঘষ হয়েছে। পরে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটাদের বাড়িতে গিয়ে বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করা নিয়ে শতাধিক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। বেশকিছু ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের নির্লিপ্ততার অভিযোগ উঠেছে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের অন্তত এক সপ্তাহ আগে বিকাশ, নগদ ও রকেটের লেনদেন সীমিত বা সাময়িকভাবে বন্ধ করা জরুরি। এতে করে ভোটের আগে ব্যাপক অর্থ বিতরণ কঠিন হবে ; প্রার্থীদের অবৈধ প্রভাব বিস্তার কমবে; সাধারণ ভোটার চাপ ও প্রলোভন থেকে মুক্ত থাকবে।

কঠোর আইন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রস্তাব : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল লেনদেন বন্ধ করলেই হবে না-এ বিষয়ে এখনই কঠোর আইন প্রণয়নও জরুরি। প্রস্তাবগুলো হলো ভোট কেনাবেচায় প্রমাণ মিললে প্রার্থিতা তাৎক্ষণিক বাতিল; সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা অর্থ লেনদেনে যুক্ত ব্যক্তি ও এজেন্টদের গ্রেপ্তার ও কালো তালিকভুক্তি; প্রার্থী দল, এবং প্রার্থীদের নিকটজনের ব্যাংক হিসাব এবং এমএফএস হিসাব নির্বাচনকালীন বিশেষ নজরদারিতে আনা।

লেনদেন বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের বাস্তবসম্মত প্রস্তাব : বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের দেওয়া কয়েকটি কার্যকর সাজেশন নির্বাচনকালীন সীমিত লেনদেন; প্রতিদিন সর্বোচ্চ লেনদেন সীমা খুব কমিয়ে আনা; একাধিক নম্বরে একসঙ্গে টাকা পাঠালে স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা ; নতুন নম্বর নিবন্ধন ও ক্যাশআউট স্থগিত; নির্বাচনের ১০ থেকে ১৫ দিন আগে নতুন বিকাশ/নগদ একাউন্ট খোলা বন্ধ; বড় অঙ্কের ক্যাশআউট সাময়িক স্থগিত, নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ ব্যাংক এমএফএসের যৌথ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম মনিটরিং ; সন্দেহজনক লেনদেন হলে তাৎক্ষণিক ব্লক; ভোটের আগের ৭ দিন ‘রেড এলার্ট জারী ; এ সময় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট নম্বরগুলোতে; লেনদেন স্থগিত বা কঠোর নজরদারি; প্রয়োজন ছাড়া লেনদেন করলে জবাবদিহিতা।

আদালতের অনুমতি নিয়ে ভোটারদের বিকাশ, নগদ, রকেট একাউন্ট পরীক্ষা করে কিছু ব্যবস্থা নিলেই ভীতি ছড়িয়ে পড়বে। একই সঙ্গেই ঘোষণা দেয়া নির্বাচনের পরের এক সপ্তাহও ভোটাররা কোনো অর্থ সংগ্রহ করেছে তা পরীক্ষা করা হবে তাহলে কেউই ভোট কেনাবেচার সাহস পাবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ভোট কেনাবেচা শুধু আইন লঙ্ঘন নয়-এটি সরাসরি গণতন্ত্র হত্যার শামিল। ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা যদি নির্বাচনে কালো টাকার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে জনগণের ভোটাধিকার অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোরালো আহ্বান-এখনই সিদ্ধান্ত নিন, কঠোর হোন, প্রয়োজনে অজনপ্রিয় হলেও নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করুন।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জুলকারনাইন বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং-এ কোন লেনদেন হলে তা নির্বাচনী প্রচারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা তা প্রমাণ করার কোন সুযোগ নাই। এক্ষেত্রে ভোটাররা যদি নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য, ফোন নম্বর সুরক্ষিত রাখে তাহলে এ অপরাধ কিছুটা কমতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি অর্থরিটি চাইলে টোটাল লেনদেন নিয়ন্ত্রণের নানা উপায় রয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments