শিক্ষা খাতে ডজন চ্যালেঞ্জ

প্রতিবছর শিক্ষাখাতে খরচ হয় কয়েক হাজার কোটি টাকা। তারপরও নিশ্চিত হয়নি শিক্ষার গুণগতমান। রয়েছে নানা সংকট। নতুন সরকারের সামনে শিক্ষা খাতে ১৩টি চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিক্ষক সংকট, উচ্চ শিক্ষায় সরকারি কলেজে একই শিক্ষক দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা দেওয়া, কারিগরি শিক্ষায় নারীদের কম অংশগ্রহণ ও চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা তৈরির অভাব, ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাক-প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ না করা, প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, মাধ্যমিক শিক্ষায় অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষার্থী ভর্তি, ভর্তির ক্ষেত্রে ধনী-গরিবের ব্যবধান, মাদ্রাসা শিক্ষার মান চাকরির বাজারে সঙ্গে সামঞ্জস্য নয়।

এছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান ও গবেষণা পরিচালনার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত সন্তোষজনক নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরতদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো একক নীতিমালা নেই, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা নিজেদের মালিক মনে করেন, গবেষণার জন্য মানসম্মত ফ্যাকাল্টি না থাকা এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রচলিত ধ্যান-ধারণা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে অনেকটাই ভিন্ন।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী, মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা। শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে শিক্ষা খাতের চলমান কার্যক্রম ও সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষায় যা আছে: বিএনপির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহার জায়গা করে নেওয়া শিক্ষার বিষয়গুলো হলো শিক্ষাখাতে জিডিপি’র পাঁচ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ প্রদান; ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব; মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন; লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস (আনন্দময় শিক্ষা); বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা; সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা; ক্রীড়া ও দেশীয় সংস্কৃতি শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি; স্বাস্থ্য ও খাদ্যে অগ্রাধিকার; সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক; প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব; শিক্ষাখাতে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য নিরসণ; ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু; ‘বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস’ প্রদান; রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো; ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন; গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের আহতদের সহায়তা প্রদান; সর্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণ; বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের শিক্ষা উন্নয়ন; অনন্য ডিজিটাল পরিচয় বা এডু-আইডি প্রবর্তন; ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি কর্মসূচি বাস্তবায়ন; শিক্ষার্থীদের পোষ্য প্রাণী পালন উৎসাহিতকরণ; গ্রীষ্মের ছুটির কর্মমুখী ব্যবহার।

বরাদ্দ কম: শিক্ষাবিদরা বলেন, শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাতে গত ২২ বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনি¤েœ বাংলাদেশ। পরিসংখ্যানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা খাতে অন্তত জিডিপির ছয় ভাগ বা বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ ব্যয় হওয়া উচিত। তবে দেশে বছরের পর বছর এ বরাদ্দ জিডিপির দুই শতাংশ এবং বাজেটের ১২ শতাংশের আশপাশেই সীমাবদ্ধ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ১৮৯টি সদস্যদেশের মধ্যে যে ১০টি দেশ অর্থনীতির আকারের তুলনায় শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয়, বাংলাদেশ তার একটি। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ২০ ভাগ এবং মোট জিডিপির ছয় শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। তবে কোন সরকারই তা আমলে নেয়নি। বিএনপির টার্গেট ডিজিপির অন্তত ৫ ভাগ শিক্ষাখাতে ব্যয় করার।

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত, ব্যতিক্রম বাংলাদেশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, শিক্ষায় বারবার শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কারণে আমরা আন্তর্জাতিক মান থেকেও পিছিয়ে পড়ছি। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত। এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থায় সব শিক্ষার্থীকে একই বই পড়ানো হয় এবং একই ধরনের শিক্ষা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ১১ ধরনের। ধরনভেদে প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রমেও রয়েছে ভিন্নতা।

সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কারিকুলাম চালু আছে অন্তত পাঁচ রকমের। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। ধরনভেদে প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রমের ভিন্নতার কারণে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যায় শেষে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার স্তরে তৈরি হচ্ছে পার্থক্য। এছাড়া সামাজিক বৈষম্যও বাড়ছে। তাই একমুখী শিক্ষাক্রম চালুর পাশাপাশি যুগোপযোগী সংস্কার করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

কারিগরি শিক্ষায় বেহাল দশা: দেশে ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষা বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু দেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ নারী হওয়া সত্ত্বেও ডিপ্লোমা প্রকৌশল কোর্সে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশের বেশি মেয়ে ভর্তি হয় না। এর মূল কারণ কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে অভিভাবকের অসচেতনতা। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের পছন্দের কোর্সও তেমন নেই। বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত টেকনোলজি চালু করা সময়ের দাবি। জানা গেছে, শিক্ষক সংকট, উপকরণের অভাব, অনুন্নত কারিকুলামসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের কারিগরি শিক্ষা।

বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে কারিগরি শিক্ষায় সরকার বিশেষ জোর দিলেও কাত লক্ষ্য অর্জন হয়নি। বিভিন্ন পলিটেকনিক, মনোটেকনিক এবং কারিগরি স্কুল ও কলেজে শিক্ষক পদের ৭০ শতাংশই শূন্য আছে। এছাড়া জনশক্তি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যুরোর অধীন কারিগরি প্রতিষ্ঠানেও প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষক পদ শূন্য। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এক শিফটের শিক্ষক দিয়ে চালানো হচ্ছে দুই শিফট। অনেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরি সংকট। আবার ল্যাব থাকলেও নেই যন্ত্রপাতি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা আরো নাজুক।

শিক্ষা প্রশাসনে বদলি আতঙ্ক: এদিকে শিক্ষা প্রশাসনে এখনো অনেকের মাঝে বদলির আতঙ্ক কাজ করছে। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা দীর্ঘদিন প্রশাসনিক পদে আছেন এবং চাকরির মেয়াদ শেষের দিকে, তাঁদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বেশি।

কয়েকজন কর্মচারী জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় বড় ধরনের রদবদল হতে পারে-এমন ধারণা থেকেই অনেক কর্মকর্তা রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করছেন। কে কোন পদে থাকবেন বা বদলি হবেন-এসব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে দপ্তরগুলোতে। এরই মধ্যে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী অনেক শিক্ষক কে কোন পদে বসবেন, কাকে বাদ দেওয়া হবে তা নিয়ে তালিকা প্রস্তুত শুরু করেছেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments