ভাষা আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং জাতীয় চরিত্রের একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন। যে আন্দোলন দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে বাঁকফেরা গুণগত পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এর প্রমাণ বায়ান্ন থেকে পরবর্তী কয়েক বছরের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন। এ আন্দোলনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে নানা পোস্টার, সংকলন, সাহিত্য সাময়িকীসহ সাড়াজাগানো একেকটি প্ল্যাকার্ড। এসবের প্রতিক্রিয়া বারুদের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সবখানে!
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা উপস্থাপন করল সেসব কর্মকা-ের ঐতিহাসিক দলিলসমৃদ্ধ ‘সংকলন’ শীর্ষক সপ্তাহব্যাপী একটি চিন্তানির্ভর প্রদর্শনী, যা দেশজ ও লোকজ মুদ্রিত সংস্কৃতির মাধ্যমে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে নতুনভাবে অনুসন্ধান করেছে।
সংকলন দেখায় কীভাবে গত সাত দশক ধরে সংবাদপত্র, সাময়িকী, সাহিত্য সাময়িকীর সংখ্যা ও পুস্তিকা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, স্মৃতি ও পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই প্রদর্শনীতে মূল আর্কাইভ উপকরণ ও নির্বাচিত পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে দৈনন্দিন মুদ্রণপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ভাষা আন্দোলনের চর্চা নথিবদ্ধ, বিস্তৃত ও জীবিত থেকেছে। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভিজ্যুয়াল ও পাঠ্য ভাষার রূপান্তর, যা জনস্মৃতি ও রাজনৈতিক চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
এই বহুমাত্রিক বিন্যাসে সংকলন দর্শকদের সামনে তুলে ধরল সংগ্রামের ইতিহাস রক্ষায়, সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে এবংসামষ্টিক স্মৃতি টিকিয়ে রাখতে মুদ্রিত সংস্কৃতির গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। এছাড়া ঐতিহাসিক উপকরণের সঙ্গে সংকলন প্রদর্শনীতে যুক্ত হয়েছে আর্কাইভাল প্রিন্ট দ্বারা অনুপ্রাণিত নতুন পোস্টকার্ড ও পোস্টার। পাশাপাশি, লোকজ মুদ্রণ সংস্কৃতির ভাবনা থেকে জন্ম নেওয়া সমকালীন শিল্পকর্মের একটি নির্বাচিত সংগ্রহ অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে, যা দেখায়-এই ঐতিহ্যগুলো আজও কীভাবে সমাজে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।
এই বহুমাত্রিক বিন্যাসে সংকলন দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছে সংগ্রামের ইতিহাস রক্ষায়, সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে এবং সামষ্টিক স্মৃতি টিকিয়ে রাখতে মুদ্রিত সংস্কৃতির গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা।
প্রদর্শনীর কিউরেটর ছিলেন অনিন্দ্য রহমান। যিনি একজন শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর কর্মকান্ড চলমান চিত্র, মুদ্রণমাধ্যম এবং কিউরেটরিয়াল চর্চার বিভিন্ন পরিসরে বিস্তৃত। তাঁর শিল্পচর্চা এমন এক ধারণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, যাকে তিনি ‘ফ্লিটিং কমন্স’ বা ক্ষণস্থায়ী সামূহিকতা হিসেবে অভিহিত করেন-যা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও স্থায়িত্বকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রান্তে অবস্থিত অস্থায়ী সামাজিক, বস্তুগত ও দৃশ্যগত পরিসরকে নির্দেশ করে।
‘সংকলন’ তাঁর নেতৃত্বে আয়োজিত চতুর্থ প্রদর্শনী, যেখানে খ-াংশ, আর্কাইভ এবং বিচ্ছিন্ন জনস্মৃতি নিয়ে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানের একটি সম্প্রসারিত রূপ প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রদর্শনী চলবে আগামি শনিবার পর্যন্ত বিকাল ৩ টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। রবিবার বন্ধ। প্রদর্শনীর দরজা সবার জন্য খোলা।



