ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি মামুন খালেদ রিমান্ডে

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে রাজধানীর মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করে ডিবি। এর আগে বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরের ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সকে (ডিজিএফআই) রাজনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত করা, জঙ্গি নাটকের প্রবক্তা, দুর্নীতি মাধ্যমে জলসিঁড়ি আবাসনের শতকোটি টাকা আত্মসাৎ, আয়না ঘরের রূপকার এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের ক্ষমতা অপব্যবহার করে হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে।
গত বছরের মে মাসে শেখ মামুন খালেদ, তার স্ত্রী নিগার সুলতানা খালেদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেওয়া হয়। তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার আবেদনে বলা হয়, শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শেয়ার ব্যবসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে।অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদ্বয় দেশ ছেড়ে বিদেশে পলায়ন করতে পারেন মর্মে অনুসন্ধানকালে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়।

অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা একান্ত প্রয়োজন।

রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে রাজধানীর মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।পুলিশের আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিদ্দিক আজাদ এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন এ তথ্য জানান।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) কফিল উদ্দিন। তিনি এ মামলায় মামুন খালেদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছিলেন।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বেলা ৩টা ২০ মিনিটে দেলোয়ার হোসেন (৪০) জুলাই ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে মিরপুর-১০ নম্বর ফলপট্টিতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় এজাহারভুক্ত আসামিসহ অজ্ঞাতনামা ৫০০ থেকে ৭০০ জন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসীরা মামুন খালেদের নির্দেশে নির্বিচার গুলি চালায়।

এতে দেলোয়ার হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়েন। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ জুলাই দেলোয়ার মারা যান। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করে। এ মামলার ঘটনার সঙ্গে মামুন খালেদের জড়িত থাকার বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনসহ সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মামুন খালেদকে নিবিড়ভাবে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড দরকার। শুনানি শেষে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আদালতে যা বললেন মামুন খালেদ : পুলিশের আবেদনের ওপর শুনানিতে আদালতে মামুন খালেদ কথা বলেন। শুনানির সময় মামুন খালেদ আদালতকে বলেন, ‘আমি ২০০৭ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) ফোর্সেস সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে যোগদান করি, যারা মূলত যোগাযোগব্যবস্থার দায়িত্ব পালন করে। সেখানে জুলাই পর্যন্ত কাজ করার পর আমি দায়িত্ব গ্রহণ করি। সে সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং জনাব তারেক রহমানের যতগুলো মামলায় জামিন হয়েছিল, সেই প্রত্যেকটি জামিনের ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বিচারকের কাছে টেলিফোন করতাম। আমাদের পক্ষ থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হতো।’

বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে নজরুল সাহেবের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওনা আছে। জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া আমাকে এই টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যা তিনি ফেসবুকে উল্লেখ রয়েছে। আমি সেই টাকা উদ্ধার করে দিয়েছি।

’‘আয়নাঘর’ প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তার ভাষ্য, তিনি দুই থেকে তিনবার গুম কমিশনের সামনে শুনানিতে অংশ নিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন, ২০১১ সালের ২৩ জুন থেকে ২০১৩ সালের ৭ মার্চ পর্যন্ত তার দায়িত্ব পালনকালে কোনো অভিযোগ ছিল না।

তিনি বলেন, ‘তৎকালীন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মতিউর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাকিম স্যারকে আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন; ওই সময়ে আমাদের যে শাখাটি ছিল (যা পরবর্তী সময়ে আয়নাঘর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে), সেখানে কোনো ব্যক্তিকে আটকে রাখার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

আদালতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে শেখ হাসিনার সময়ের সাতজন ডিজিএফআই প্রধানের মধ্যে পাঁচজনই বিদেশে আছেন। আমি দেশেই আছি। আমি যদি কোনো অপরাধে সম্পৃক্ত থাকতাম, তবে গত ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে আসতাম না।

আমার মেয়ে পিএইচডি করছে, তাকে মানসিক সমর্থন দেওয়ার জন্য আমি জুলাই মাসে বিদেশে গিয়েছিলাম এবং পুনরায় ফিরে আসি। আমার মনে যদি কোনো ধরনের সংশয় বা ভয় থাকত, তবে আমিও অন্যদের মতো বিদেশে থেকে যেতে পারতাম।’

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে নিজের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি বিইউপি-এর চার বছর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার হাত ধরেই এখানে ১৭টি বিষয় এবং ৫টি অনুষদ চালু হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যদি ছাত্ররা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে, তবে তারা তাদের উপাচার্যের মাধ্যমেই অনুপ্রাণিত হয়েছে।

’গত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নিজের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই মাসে আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না, আমি তখন একজন সাধারণ বেসামরিক ব্যক্তি। আমি ডিওএইচএসেই ছিলাম। আমার বাসায় একটি ছোটখাটো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আছে এবং আমি সেটির চেয়ারম্যান। আমাদের নিয়মিত যাতায়াতের পথ হচ্ছে কালশী উড়ালসড়ক (ফ্লাইওভার), মিরপুর-১০ এর পথে আমাদের যাওয়ার কোনো কারণ বা প্রয়োজন পড়ে না। সুতরাং, আমাকে রিমান্ডে বা জিজ্ঞাসাবাদের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’

প্রসঙ্গত, মামুন খালেদ২০০৭-০৮ সালের সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের শেষ দিকে ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি একই পদে ছিলেন। এরপর ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হন তিনি। ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন।

একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মামুন খালেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছিল। এর মধ্যে ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ, এক-এগারোর সময় তার বিতর্কিত ভূমিকা এবং জলসিঁড়ি আবাসনসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়গুলো রয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments