বাংলাদেশি কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় শূন্যে নামিয়ে আনতে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ন্ত্রিত নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে মালয়েশিয়া। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নির্দেশিকা অনুযায়ী ‘এমপ্লয়ার পেজ প্রিন্সিপল’ (নিয়োগকর্তা কর্তৃক সম্পূর্ণ ব্যয় বহনের নীতি) মেনে এই ব্যবস্থা পরিচালিত হবে।

ফলে অভিবাসন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং কর্মীদের জন্য ‘শূন্য খরচ’ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়নে মালয়েশিয়ার সঙ্গে একযোগে কাজ করার আগ্রহ ও পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছে।
গত বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দুই দেশ একমত হয়।
গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীলরা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ উদ্যোগের ফলে বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালুর বিষয়ে উভয় দেশ সম্মত হয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে শ্রম অভিবাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মালয়েশিয়ার পক্ষে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো শ্রী রামানান রামাকৃষ্ণান।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর নতুন সরকারের অধীনে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় খোলার নতুন আশা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের মে মাসের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার কর্মীকে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এই খাতের সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আগের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চললে আবারও পুরনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে পারে। কারণ ওই চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা মালয়েশিয়াকে দেওয়া হয়েছিল।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার পক্ষে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় খোলার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। একটি সুষ্ঠু, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস করা এবং আটকে পড়া কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুততর করার জন্য কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানের বিষয়েও বৈঠকে জোর দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্য এবং যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কাজে লাগানো হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এ বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, কর্মী নিয়োগে মালয়েশিয়ার নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, কর্মী পাঠানো সব দেশের জন্যই তারা একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও ‘এআই-ভিত্তিক’ নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে।
সরকারের দায়িত্বশীলরা জানান, বৈঠকে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মানব পাচার সংক্রান্ত চলমান আইনি মামলাগুলো নিয়েও দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনা করেছেন। এতে মালয়েশিয়া জানায়, তাদের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে এমন যেকোনো ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকান্ড মোকাবিলার প্রয়োজন রয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আইনের শাসন, জবাবদিহিতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতে নিজস্ব অবস্থান ও প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। এছাড়া অনিয়মিত কর্মীদের বিদ্যমান সমস্যা সমাধান এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও সনদায়ন বাড়ানোর বিষয়েও উভয়পক্ষ আলোচনা করেছে বলে জানানো হয়েছে।


