বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার একদিন নিজের সমস্ত আবেগ আর তুলির আঁচড়ে রূপ দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের সেই চিরভাস্বর লাল সূর্যের নকশাকে, শেষ বিদায়ের ক্ষণে এসে যেন সেই লাল সূর্যই যেন তাঁর চিরবিদায়ের ব্যাকড্রপ হয়ে রইল। বাংলাদেশের এই পাপেট শিল্পের প্রধান দূরদর্শী রূপকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সহকর্মী, আলোকচিত্রী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পরিবারের সদস্য, শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী ও সর্বস্তরের মানুষেরা।

বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের আয়োজনে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন তারা। শ্রদ্ধা জানানো শেষে মুস্তাফা মনোয়ারকে ১২টা ৪৫ মিনিটে এস আই সাইফুল আলমের নেতৃত্বে জানানো হয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘গার্ড অব অনার’।
এর পরে তার মৃতদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। এর আগে সকাল ৮টা ৫৫মিনিটে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে শিল্পীর মরদেহ নেওয়া হয়। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সকাল নয়টায় শিল্পীর প্রথম জানাজা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ, নাট্যব্যক্তিত্ব ম হামিদসহ শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক বিশিষ্টজনেরা। এরপর শিল্পীকে শেষবারের মতো নেওয়া হয় তাঁর প্রথম কর্মস্থল চারুকলা অনুষদে।
এ সময় শিল্পী হাশেম খান, অনুকূল দাস, তামান্না তিথি, কাওছার হাসান টগর, আলপ্তীনগীর তুষার, মুনিরা জামান ও রশীদ আমিনসহ বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন। যেখানে একমিনিট নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান। দুপুর ২টায় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি জানাজা। সবশেষে বিকেল সাড়ে ৩ টায় বনানী কবরস্থানে শিল্পীর বাবা তোফায়েল উদ্দিন আহমেদের কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হন বাংলাদেশের শিল্প- সংস্কৃতির এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, মুস্তাফা মনোয়ারের স্ত্রী মেরী মনোয়ার, ছেলে সাদাত মনোয়ার, চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম, হাশেম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ, অভিনেতা শংকর সাওজাল, অভিনেতা তারিক আনাম খান, অভিনেতা কেরামত মাওলা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, অভিনেতা খায়রুল আলম সবুজ, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ, শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, অভিনেতা ও ডিরেক্টরস গিল্ড অব বাংলাদেশের সভাপতি শহীদুজ্জামান সেলিম, নাট্যজন নিমা রহমান, নাট্যজন আজাদ আবুল কালাম, ছায়ানটের সাধারন সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা, কল্পনা আনাম, নাট্যশিল্পী ত্রপা মজুমদার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজমসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের অসংখ্য বিশিষ্টজনেরা।

এরপর একে একে শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগ, ভাস্কর্য প্রাক্তনী সংঘ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, গ্যালারি কসমস, স্টুডিও-৪৮, ছাত্র ইউনিয়ন, শহীদ লে. সেলিম শিক্ষালয়ের কালচারাল ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী, দুরন্ত টেলিভিশন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট, কর্মজীবী নারী, বাংলা একাডেমি, বটতলা, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, গোলাম মোস্তফা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, পাঠশালা, প্রাচ্যনাট, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বঙ্গরঙ্গ নাট্যদল, থিয়েটার, আবদুল্লাহ আল মামুন থিয়েটার স্কুল, নাট্যম রেপার্টরি, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, স্বনন, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, কণ্ঠশীলন, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন।
স্মৃতিচারণ করে শিল্পী হাসেম খান বলেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার দেশের বিভিন্ন শিল্পকলার বিকাশ ও উত্তরণের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। এদেশের লোক-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পুতুলনাচ ও লোকপুতুল, যা একসময় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। মুস্তাফা মনোয়ার ধীরে ধীরে সেই পুতুলনাচ, পুতুল নির্মাণ এবং গ্রামীণ পুতুলের ঐতিহ্যকে নতুন সৃষ্টিশীলতার পথে নিয়ে আসেন। সেই পুতুলকে কেন্দ্র করে তিনি দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছেন।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘শিল্পের জাদুকাঠির ছোঁয়ায় জাতিকে স্নাত, জাগ্রত ও সৃষ্টিমুখর করে তোলার নিরন্তর সাধক, অনিরলস কর্মবীর মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতি জানাই অপরিমেয় শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। কৈশোরে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তিনি কারাবরণ করেছিলেন। সেটিই ছিল তার জীবনের প্রাথমিক পাঠ, যা আজীবন অন্তরে ধারণ করে রেখেছিলেন। কিন্তু স্বভাবগুণে এই অর্জন নিয়ে কখনো উচ্চকিত হননি। বরং সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছিলেন সমাজকে শিল্পিত করে তোলার সাধনায়।’
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক, আমার নির্দেশক এবং জীবনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন মানুষ। তাঁর চলে যাওয়ায় আমি যেন নিজের জীবনেরই একটি বড় অধ্যায় হারিয়ে ফেললাম।’

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘আমরা যারা ষাট ও সত্তরের দশকে বেড়ে উঠেছি, তারা মূলত তার সৃষ্টিশীলতা ও নান্দনিকতার আবহেই বেড়ে উঠেছি। যুদ্ধ ও শিল্পকে একসূত্রে গাঁথতে পেরেছিল আমাদের প্রজন্মের অনেক তরুণ; মুস্তাফা মনোয়ারও ছিলেন সেই ধারার একজন। তিনি আমাদের শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক নন, জীবনের শিক্ষক; সংস্কৃতি ও শিল্পের শিক্ষক। তাকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন কখনোই পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না।’
অভিনেতা তারিক আনাম খান বলেন, ‘মীনা কার্টুন, সিসিমপুরসহ অসংখ্য সৃজনশীল উদ্যোগের পেছনে ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার সৃষ্টিশীলতা ও অবদান আমাদের সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমকে সমৃদ্ধ করেছে। আমরা যদি তার কাজগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে পারি, সেটিই হবে তাকে স্মরণ করার সবচেয়ে ভালো উপায়। তার সংগ্রাম, আদর্শ এবং ভালো কাজগুলো চর্চার মধ্য দিয়েই তার স্মৃতিকে জীবন্ত রাখা সম্ভব।’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘জীবনের প্রায় সাত দশক ধরে তিনি চিত্রশিল্পসহ সমগ্র সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ভাষা আন্দোলনের সময় ছবি আঁকার কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি অসাধারণ ভূমিকা রেখে গেছেন। তার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।’
বাংলা ভাষা ও কয়েক প্রজন্মের শৈশবের জাদুকর
তাঁর শিল্পচর্চা শুধু বিনোদনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা মিশে ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে। কয়েক প্রজন্মের শৈশবের জাদুকর ছিলেন তিনি। টেলিভিশনের সোনালী যুগের সারথী এই অনন্য মানুষটি।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) শুরুর দিনগুলোতে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। বিটিভির উপ-মহাপরিচালক হিসেবে তিনি টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণে এক নতুন যুগের সূচনা করেন। তাঁর নির্দেশিত নাটক, বিশেষ করে শেকসপিয়রের ‘রক্তকরবী’র টেলিভিশন রূপান্তর আজও এক মাইলফলক হয়ে আছে। ‘মনের কথা’, ‘পিপার ডল’ কিংবা ‘পারুলের গল্প’এমন অসংখ্য শিশুতোষ ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কয়েক প্রজন্মের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিশুদের মনের ভাষা তিনি পড়তে পারতেন সবচেয়ে ভালো, তাই তো তিনি ছিলেন শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় ‘মুস্তাফা ভাই’।
চারুশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, শিল্প গবেষক, বাংলাদেশে পাপেট চর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ-বহু পরিচয়ে পরিচিত তিনি। তার এত পরিচয়ের পেছনের কারণ পারিবারিক আবহ। তার বাবা কবি গোলাম মোস্তফা, যিনি শুধু কবিতাই লিখতেন না, ভালো গানও গাইতেন। । ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরের শ্রীপুরে নানা বাড়িতে মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম। ডাক নাম ছিল মন্টু। বরেণ্য এই শিল্পীর পৈত্রিক নিবাস ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে।
স্কুলে থাকতে বাবার ক্যামেরা দিয়ে ফটোগ্রাফি করতেন মুস্তাফা মনোয়ার। ছয় ভাইবোনের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সবার ছোট। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মা জমিলা খাতুনকে হারান মুস্তাফা মনোয়ার।
ছেলেবেলা থেকেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর টান তৈরি হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের মনে। ১৯৫২ সালে তিনি যখন নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্র, সে সময়েই তিনি প্রতিবাদী কিশোর। ভাষা আন্দোলন নিয়ে এঁকেছিলেন কার্টুন। ফলে পাকিস্তানি সরকারের রোষানলে পড়ে মাসখানেকে জেলে থাকতে হয়েছিল।
ম্যাট্রিক পাস করে মুস্তাফা মনোয়ার চলে যান কলকাতায়, সেখানকার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞানে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে তার ভালো লাগেনি। পরে ভর্তি হন কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। জলরঙে ভালো ছবি আঁকতেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার ছীব দেখে চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ বলেছিলেন, মুস্তাফার আঁকা ছবি অল্পতে কথা বলে। আর্ট কলেজে পড়ার সময়ই কলকাতায় শিল্পী হিসেবে তার পরিচিতি তৈরি হতে থাকে।
কলকাতার সেই দিনগুলোতে নাটকের দলের সঙ্গে কাজ করেছেন মুস্তাফা মনোয়ার। ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর ছাত্র সন্তোষ রায়ের কাছে গানও শিখতে শুরু করেছিলেন। শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে ছিলেন বছর তিনেক।
পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের উদ্যোগে যে সাংস্কৃতিক দল গড়ে উঠেছিল, তাতে যোগ দিয়ে দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন এই চিত্রশিল্পী।
১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন মুস্তাফা মনোয়ার। পরের বছর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন।
তিনি নিজেকে কেবল চারুকলার গণ্ডিতে আটকে রাখেননি মুস্তাফা মনোয়ার। তার আগ্রহ এবং কাজের জায়গা ছিল টেলিভিশনন। ১৯৬৫ সালে ডিআইটি ভবনে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হলে চারুকলার চাকরি ছেড়ে সেখানে যোগ দেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার টেলিভিশনে যোগ দেওয়ার কারণ ছিল বৈরী সময়ে বাংলার সংস্কৃতিকে সামনে তুলে ধরা।
তখন টেলিভিশনে দিনের অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে পতাকা ওড়ানো দেখানো হত। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ মুস্তাফা মনোয়ারসহ পিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা ঠিক করলেন, পাকিস্তান দিবসে তারা পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে দেখাবেন না। সেজন্য তারা এক কৌশল করলেন। দিনের অনুষ্ঠানমালা শেষ হওয়ার কথা রাত ১০টায়। কিন্তু সেদিন তারা অনুষ্ঠান শেষ করতে রাত ১২টা পার করে দিলেন। ততক্ষণে তারিখ বদলে ২৪ মার্চ হয়ে গেছে। তখন পতাকা দেখিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করা হল বটে, কিন্তু পাকিস্তান দিবসে তারা পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে দেখানো হল না। ওই মাসেই টেলিভিশন থেকে ফজল-এ- খোদার রচনায় এবং আজাদ রহমানের সুরে ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’ গণসংগীতটি প্রচারিত হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায়।
গানটি গেয়েছিলেন দশজন শিল্পী, কিন্তু যখন গানটি প্রচারিত হয় তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল যেন কয়েকশ শিল্পী একত্রে গানটি গাইছেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানও অনন্য। ১৯৭৩ সালে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর টেলিভিশন নাট্যরূপ দেন মুস্তাফা মনোয়ার। শেক্সপিয়ারের টেমিং অব দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকটিও বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায়।
যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্টি অব টিভি ড্রামা’র জন্য এই নাটক দুটি মনোনীত হয়েছিল। মিশুক ও নতুন কুড়ি ফুটলো তার হাতে। দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট মিশুকের নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ারই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল রঙের সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপন করেছিলেন।
‘পাপেটম্যান’ হিসেবে পরিচিত মুস্তাফা মনোয়ারকে ছোটবেলায় গ্রামবাংলার পুতুলনাচ আকৃষ্ট করেছিল। তাকেই বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনী সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের পুরোধা বলা হয়। কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেন। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার আছে। প্রথমবার তিনি তার নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাসখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট দারুণ প্রশংসিত হয়। ১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফী তার একটি ডকুমেন্টারিতে মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেটকে অন্তর্ভুক্ত করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত মলিন চেহারা মুস্তাফা মনোয়ারকে ব্যথিত করে। তাই বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সেই শরণার্থীশিবিরেই আয়োজন করেন পাপেট শো।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশের শিল্পজগতে মুস্তাফা মনোয়ার মেলে ধরেন পাপেটের এক নতুন রূপ। তার অনবদ্য সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ দেখে ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগি উৎসাহিত হন; তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি। এছাড়া টেলিভিশনে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে নিয়মিতভাবে প্রদর্শনী হয় মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট চরিত্র ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’।

শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক পাওয়া এই শিল্পী বর্ণিল কর্মজীবনে আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯০ সালে টিভি নাটকের জন্য টেনাশিনাস পদক, ১৯৯২ সালে চারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে শিশু শিল্পকলা কেন্দ্র কিডস কালচারাল ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম কর্তৃক কিডস সম্মাননা পদক, ২০০২ সালে চিত্রশিল্প, নাট্য নির্দেশক এবং পাপেট নির্মাণে অবদানের জন্য শিশুকেন্দ্র থেকে বিশেষ সম্মাননা লাভসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।



