বন্ধ ও লোকসানি ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ চায় সরকার। এসব কারখানা পরিচালনায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), জয়েন্ট ভেঞ্চার, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা কিংবা সরাসরি বিক্রির মতো বিভিন্ন মডেল বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। এই তালিকায় যেসব প্রতিষ্ঠান সচল রয়েছে সেখানে অব্যবহৃত জমি ব্যবহারেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্ধ ও লোকসানি কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) ৪টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি, বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ১৩টি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন ৫টি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ কারখানার জমিতে বিদ্যমান অবকাঠামো রয়েছে। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। এ কারণে এসব শিল্প ইউনিট বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। ৪৪টি কারখানার পূর্ণাঙ্গ তালিকা, সেখানে বিনিয়োগ সম্ভাবনা, জমির পরিমাণ ও সম্পদের বিস্তারিত তথ্য গতকাল প্রকাশ করেছে বিডা।
এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, অবকাঠামোগত অবস্থা, বাজার-চাহিদা, লাভজনক হিসেবে গড়ে তোলাসহ নানা দিকও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই তালিকায় যেগুলো বন্ধ রয়েছে সেগুলো সচল করা, যেগুলো সচল রয়েছে কিন্তু অব্যবহৃত জমি রয়েছে সেখানে বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
যেমন সচল থাকা প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (পিএলআই)-এর ১০ একর জমি অব্যবহৃত রয়েছে। বাংলাদেশের বার্ষিক গাড়ি বা যানবাহনের চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার ২০০ থেকে ৪৭ হাজার ৭২২ ইউনিট, যার মধ্যে প্রগতির দখলে আছে মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশের মতো। সীতাকুন্ডের বাড়বকুন্ডে প্রগতির ২৪.৭৫ একর জমির মধ্যে ১০ একর জমি এখনও অব্যবহৃত রয়েছে। এই অব্যবহৃত জমি ব্যবহারে বিনিয়োগ প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রগতিতে বর্তমানে শুধু পাজেরো বা মাহিন্দ্রা গাড়ি সংযোজন হয়, কিন্তু এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট, আধুনিক বডি ও পেইন্ট শপ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) অ্যাসেম্বলিং লাইন স্থাপনের বিশাল সুযোগ রয়েছে।
এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড (এবিএল) বর্তমানে বাংলাদেশের দ্রæত বর্ধনশীল ইলেকট্রিক টু-হুইলার (ইভি) বাজারের প্রায় ৮শতাংশ দখল করে আছে। টঙ্গীতে অবস্থিত এই কারখানার মোট ৯.৬২ একর জমির মধ্যে ৬৪ শতাংশ বা ৬.১২ একর জমিই খালি পড়ে আছে, যা স¤প্রসারণের জন্য প্রস্তুত।
বগুড়ার প্রস্তাবিত আধুনিক স্টিল মিল কারখনায় বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে স্টিল রডের বার্ষিক চাহিদা ৯০ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ৩০ লাখ মেট্রিক টনই আমদানি করতে হয়। বগুড়ার চয়পুকুড়িয়ায় ৩ লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি আধুনিক গ্রিন স্টিল মিল স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের প্রথম স্টিল মিল হতে পারে। ফিজিবিলিটি স্টাডি অনুযায়ী এই প্রকল্পের আর্থিক ইন্টারনাল রেট অফ রিটার্ন (আইআরআর) ১৫.২৬%।
৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান: তালিকায় রয়েছে, সেতাবগঞ্জ সুগার মিল বোচাগঞ্জ, দিনাজপুর; ঠাকুরগাঁও সুগার মিল বালিয়াডাঙ্গী রোড, ঠাকুরগাঁও; কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড (কেপিএমএল) চন্দ্রঘোনা, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা; জিল বাংলা সুগার মিল দেওয়ানগঞ্জ, জামালপুর; রাজশাহী সুগার মিল হরিয়ান, রাজশাহী; পঞ্চগড় চিনিকল পঞ্চগড়; জয়পুরহাট চিনিকল জয়পুরহাট; কুষ্টিয়া সুগার মিল, জগতি, কুষ্টিয়া; মোবারকগঞ্জ সুগার মিল কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে প্রিমিয়াম ফ্লোট গ্লাস, সোলার গ্লাস এবং সোলার প্যানেল প্ল্যান্ট; ফরিদপুর সুগার মিল মধুখালী, ফরিদপুর; জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (জিইএমসিও) উত্তর পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম; লতিফ বাওয়ানী ও করিম জুট মিলস ক্লাস্টার ডেমরা, ঢাকা; নাটোর সুগার মিল নাটোর; চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স (সিসিসি) বাড়বকুন্ড, চট্টগ্রাম; শ্যামপুর সুগার মিল বদরগঞ্জ, রংপুর; পাবনা সুগার মিল দাশুরিয়া, পাবনা; খুলনা নিউজপ্রিন্ট অ্যান্ড হার্ডবোর্ড মিলস খালিশপুর, খুলনা; রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং (বিডি) লিমিটেড কুষ্টিয়া; আমিন জুট মিলস লি. ষোলশহর, চট্টগ্রাম; প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (পিআইএল) বাড়কুন্ড ,সীতাকুন্ডে , চট্টগ্রাম; দিনাজপুর টেক্সটাইল মিলস লি. দিনাজপুর; বাংলাদেশ ইনসুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারিওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিআইএসএফএল) বক্সনগর, মিরপুর-১, ঢাকা; সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস লি. সাতক্ষীরা; রাঙ্গামাটি টেক্সটাইল মিলস লি. ঘাগড়া, রাঙ্গামাটি; টাঙ্গাইল কটন মিলস লি. মির্জাপুর, টাঙ্গাইল; দি এশিয়াটিক কটন মিলস লি. ষোলশহর, চট্টগ্রাম; চিত্তরঞ্জন কটন মিলস লি. গোদনাইল, নারায়ণগঞ্জ; খুলনা টেক্সটাইল মিলস লি. বয়রা, খুলনা; ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএলসিএল) নয়ারহাট, সাভার, ঢাকা; কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস লি. নাজিরা, কুড়িগ্রাম; টিএসপিসিএল উত্তর পতেঙ্গা, চট্টগ্রামে নতুন টিএসপি সার প্ল্যান্ট; কোকিল টেক্সটাইল মিলস লি. ব্রাহ্মণবাড়িয়া; আমিন টেক্সটাইল মিলস লি. ষোলশহর, চট্টগ্রাম; নরসিংদীর পলাশে জিপিএফপিএলসির ইউএফ-৮৫ প্ল্যান্ট; উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড (ইউজিএসএফএল) কালুরঘাট, চট্টগ্রাম; এটলাস বাংলাদেশ লি. (এবিএল) টঙ্গী শিল্প এলাকা, গাজীপুর; ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা চত্বরে ইনার লাইনার সহ ডবিøউপিপি ব্যাগ কারখানা; নো-ভিউ গেস্ট হাউস চট্টেশ্বরী, চট্টগ্রাম; খুলনা জোন অফিস চারেরহাট, খুলনা; বেঙ্গল টেক্সটাইল মিলস লি. নোয়াপাড়া, যশোর; আফসার কটন মিলস সাভার, ঢাকা; এবং পরিবেশবান্ধব আধুনিক স্টিল মিল চয়পুকুরিয়া, বগুড়া।
বিডা জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অধীনে ১০ হাজার একরের বেশি কৌশলগত শিল্পভ‚মি রয়েছে। ইস্পাত ও প্রকৌশল, রাসায়নিক, চিনি ও খাদ্যশিল্প, টেক্সটাইল এবং পাট খাতের এসব সম্পদে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু বা আধুনিকায়ন, পুনঃউন্নয়ন, ইজারাভিত্তিক পরিচালনা, যৌথ উদ্যোগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সুবিধা এবং বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বা স্বল্প ব্যবহৃত রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদকে পুনরায় উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডর আওতায় আনার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতই সবচেয়ে উপযুক্ত। সরকারের ভ‚মিকা প্রতিযোগিতা করা নয়, বরং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অনুক‚ল পরিবেশ তৈরি করা। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে আমরা দেশি-বিদেশি সব বিনিয়োগকারীকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহবান জানাচ্ছি। বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে এক বার্তায় তিনি বলেন, এটি একটি পারস্পরিক লাভজনক উদ্যোগ। একদিকে বেসরকারি খাত বিদ্যমান অবকাঠামোসমৃদ্ধ ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ সুবিধা ব্যবহার করে দ্রæত বিনিয়োগ শুরু করতে পারবে, অন্যদিকে সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পকারখানার পুনরায় সচল হওয়া এবং আর্থিক চাপ কমানোর সুফল পাবে।
এ পর্যন্ত ইস্পাত, বস্ত্র, রাসায়নিক, চিনি, খাদ্য ও পাটসহ বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আওতায় ৪৪টি বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব সম্পদের আওতায় রয়েছে ১০ হাজার একরেরও বেশি জমি। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বা অনুৎপাদনশীল সম্পদ নয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গড়ে ওঠা এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক যোগাযোগসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করছি, যাতে এসব সম্পদ আবার উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করা যায়।



