কর ক্যাডার থেকে প্রথম এনবিআর চেয়ারম্যান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান হিসেবে বিসিএস কর ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আহসান হাবিবের নিয়োগ রাজস্ব প্রশাসনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপের মধ্যেই তার এই নিয়োগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তারা বলছেন, এ নিয়োগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ৫৩ বছর পর এনবিআরের নিজস্ব কর ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তা সংস্থাটির শীর্ষ পদে দায়িত্ব পেলেন।

এনবিআরের সদস্য আহসান হাবিবকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান ২৯ জুন অবসরে যাওয়ার পর তিনি এ দায়িত্ব পান।

রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের অনেকে বলছেন, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার পর এ সিদ্ধান্ত সংস্থার ভেতরে নতুন আস্থা তৈরি করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরের কর্মকর্তাদের অন্যতম দাবি ছিল, সংস্থাটির নেতৃত্ব নিজস্ব ক্যাডার থেকেই দেওয়া হোক। বাইরে থেকে আসা কর্মকর্তাদের বদলে রাজস্ব প্রশাসনের অভিজ্ঞ পেশাদার কর্মকর্তাকে শীর্ষ পদে বসানোর দাবি ছিল তাদের।

কর্মকর্তারা বলছেন, কর ক্যাডারের একজন কর্মকর্তাকে এনবিআরের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। এতে সংস্থার প্রতি তাদের মালিকানাবোধ ও দায়িত্ববোধ আরও বেড়েছে।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘নিজেদের একজন’ সংস্থার নেতৃত্বে আসায় তারা নতুন উদ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাজ করতে চান।

বর্তমানে এনবিআরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ। এমন সময়ে অভিজ্ঞ একজন কর কর্মকর্তার নেতৃত্ব সংস্থার জন্য সহায়ক হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

তাদের মতে, মাঠপর্যায় থেকে নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে আহসান হাবিবের। রাজস্ব আদায়, কর প্রশাসন পরিচালনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় তার অভিজ্ঞতা এখন কাজে লাগবে।

আগের দায়িত্বগুলোতে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, জবাবদিহি জোরদার, কর ফাঁকি রোধ এবং বড় করদাতাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকির জন্য প্রশাসনের ভেতরে পরিচিত ছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানান।

তারা বলছেন, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, করজাল সম্প্রসারণ, করদাতাদের সেবা সহজ করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এদিকে সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে এনবিআরের ভেতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কমাতেও নতুন চেয়ারম্যান উদ্যোগ নিয়েছেন।

আন্দোলন ঘিরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে বিভক্তি ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করায় মাঠপর্যায়েও অসন্তোষ বাড়ে।

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আহসান হাবিব সমঝোতামূলক অবস্থান নেন। গত ৫ জুলাই তিনি সারা দেশের এনবিআর কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ জুম সভা করেন। সভার উদ্দেশ্য ছিল আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সংস্থার ভেতরে ঐক্য পুনর্গঠন করা।

সভায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া তিন কর্মকর্তাকে সরাসরি নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয় বলে কর্মকর্তারা জানান।

অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য শুনে এনবিআর চেয়ারম্যান সবাইকে বিভেদ ভুলে সংস্থার মূল দায়িত্বে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে রাজস্ব আদায়ই এখন এনবিআরের প্রধান দায়িত্ব।

সভায় তিনি আরও আশ্বাস দেন, আইনসঙ্গত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা প্রশাসনিক সহায়তা পাবেন। সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হলে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নেবেন বলেও জানান।

সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, চেয়ারম্যানের এই বার্তা এনবিআরের ভেতরে উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করেছে এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করেছে।

কর্মকর্তাদের মতে, নতুন চেয়ারম্যানের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকবে রাজস্ব আদায়ের দক্ষতা বাড়ানো, অনলাইন করসেবা সম্প্রসারণ, ব্যবসাবান্ধব কর পরিবেশ তৈরি, করজাল বিস্তৃত করা, ন্যায্য কর আদায় নিশ্চিত করা, কর ফাঁকি রোধ এবং কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব ও স্বচ্ছতা জোরদার করা।

তারা মনে করছেন, রাজস্ব প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ নিয়োগ হয়েছে। অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ও সংস্থার ভেতরে নতুন ঐক্য এনবিআরের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বাড়াতে এবং কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments