সীমান্ত কখনও কাঁটাতারের, কখনও রাষ্ট্রের। নবজাতকের কাছে সীমান্তের কোনো সীমারেখা নেই। তার কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় মায়ের কোল, বাবার আগলে রাখা ছায়ার আশ্রয়।
এক বছর আগে যে পরিবারটি জোরপূর্বক সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, সেই পরিবারের বিচ্ছেদের গল্প যেন অনেকটাই মনে করিয়ে দেয় বলিউডের আলোচিত চলচ্চিত্র বজরঙ্গি ভাইজান-এর মানবিক বার্তাকে।
তবে পার্থক্য একটাই সিনেমায় হারিয়ে যাওয়া শিশুকে ঘরে ফিরিয়ে দিতে একজন মানুষ লড়াই করেছিলেন, আর বাস্তবে একটি পরিবারকে নিজের দেশেই ফিরতে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ এক বছর, আদালতের নির্দেশ এবং দুই দেশের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পর সন্তান ফিরে পায় বাবার মমতা ও ভালবাসা। স্ত্রী ফিরে পান কাঁটাতারের বেড়ায় বিচ্ছেদ হওয়া তার স্বামী ও ভূমিষ্ঠ হওয়া নবজাতক পায় তার বাবার স্পর্শ।

গত বুধবার বিকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন দিয়ে মো. দানেশ শেখ, সুইটি বিবি এবং তার দুই সন্তান কুরবান শেখ ও ইমাম হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে বিজিবি।
এই প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল দানেশ শেখের জন্য। কারণ তার ছোট ছেলে ‘আপন’-এর জন্ম হয়েছিল যখন তখন তিনি বাংলাদেশে ভারতের সীমান্ত বাহিনী বিএসএফের জোরপূর্বক ‘পুশইন’ এর শিকার।
২০২৫ সালের ১৭ জুন দিল্লির রোহিণী এলাকা থেকে পরিচয় যাচাইয়ের নামে তাদের আটক করে দিল্লি পুলিশ।
পরিবারের সদস্যরা আধার কার্ডসহ পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে চিহ্নিত করা হয়। এরপর ২৫ জুন কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পুশইন করে বিএসএফ। তখন সোনালী খাতুন প্রায় তিন মাসের অন্ত:সত্ত্বা ছিলেন।
বাংলাদেশে প্রবেশের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন তারা। গত বছরের ২২ আগস্ট আদালতের নির্দেশে তাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলহাজতে পাঠানো হয়। তখন সোনালী খাতুন পয়ত্রিশ সপ্তাহের অন্ত:সত্ত্বা ছিলেন।
এই সময়ের মধ্যে সোনালী খাতুনের বাবা ভোদু শেখ কলকাতা হাইকোর্টে একটি হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দাখিল করেন, যেখানে তিনি দাবি করেন তারা পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা এবং ভারতীয় নাগরিক। গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাইকোর্ট বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে চার সপ্তাহের মধ্যে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর চার দিন পর, ৩০ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতও নথি পর্যালোচনা করে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নির্দেশ দেয়।
মামলাটি পরবর্তীতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, মানবিক বিবেচনায় সোনালী খাতুন ও তার ছেলেকে ফিরিয়ে আনা হবে।
গত বছরের ২ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে তাদের স্থানীয় জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়। পরে ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সোনালী খাতুন ও তার ছেলে সাব্বিরকে বিএসএফের নিকট হস্তান্তর করে বিজিবি। তখন স্বামী দানেশ শেখসহ বাকি চারজনকে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হলেও ভারত তাদের গ্রহণ করেনি।
দেশে ফেরার পর এ বছরের ৫ জানুয়ারি ভারতের রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন সোনালী খাতুন। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে সদ্যোজাতের নাম রাখেন “আপন”। বাবাকে না দেখেই জীবনের প্রথম সাত মাস কাটে আপনের। অবশেষে গত বুধবার সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়।

বজরঙ্গি ভাইজান চলচ্চিত্রে বোবা শিশু মুন্নিকে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যে মানবিক বার্তা উঠে আসে, বাস্তবের এই ঘটনাও যেন একই প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্রের সীমানা কি কখনও মানুষের সম্পর্কের চেয়ে বড় হতে পারে?
অবশ্য বাস্তবতার নির্মমতাও এখানে স্পষ্ট। সিনেমার মতো কয়েক দিনের অভিযানে নয়, এই পরিবারের ঘরে ফেরার জন্য লড়তে হয়েছে আদালতে, কাটাতে হয়েছে কারাগারে, অপেক্ষা করতে হয়েছে মাসের পর মাস।
সর্বশেষ চারজনকে আনুষ্ঠানিক ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে বিজিবি পুশইনের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদÐ এবং দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছিল।
তবে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ফিরলেও পরিবারের সংগ্রাম শেষ হয়নি। ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ি, এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, সীমান্তের দুই পাশের বাসিন্দাদের ভাষা, ধর্ম কিংবা জাতীয়তা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একজন মায়ের অপেক্ষা, একজন বাবার সন্তানের জন্য আকুলতা কিংবা একটি শিশুর বাবাকে প্রথমবার জড়িয়ে ধরার আনন্দ-এসবের কোনো সীমান্ত নেই।



