সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না
— প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা
সশস্ত্র বাহিনীকে কোনোভাবেই দলীয় রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম।
তিনি বলেন, বাহিনীকে একটি পেশাদার, রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ও জনমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া (রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন) ক্লাব মিলনায়তনে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন লে. জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী, রাওয়ার চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল হক, লে. কর্নেল (অব.) আবু নওরোজ খুরশীদ আলম, মেজর (অব.) নিয়াজ আহমেদ, ফ্লাইট লে. (অব.) হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া, জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর, শহীদ মীর মুগ্ধ’র ভাই মীর স্নিগ্ধ, শহীদ আসাদুল্লাহর বাবা মহিউদ্দিন প্রমূখ।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, অতীত সরকারের আমলে বঞ্চিত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিষয়ে একটি বোর্ড ইতোমধ্যে কাজ শেষ করেছে। পাশাপাশি আরও বিস্তৃতভাবে বিষয়গুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বৃহত্তর কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নির্যাতিত সহকর্মীদের ন্যায্য মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীতে পদোন্নতি ও দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে একমাত্র যোগ্যতা ও মেধাকেই বিবেচনায় নেওয়া হবে। গুম, হত্যা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধে জড়িত কেউ বিশেষ সুবিধা পাবেন না। প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
ড. শামসুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের চেতনা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিচার এবং জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে সেই চেতনা বাস্তবায়ন করা হবে। বৈষম্য দূরীকরণ, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় ঐক্য ও পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠাকেই তিনি জুলাইয়ের চেতনার তিনটি মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনে আহত যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সার্বিক কল্যাণে সরকারের সহায়তা অব্যাহত থাকবে। গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধারা শ্রেণিভেদে মাসিক ভাতা পাচ্ছেন। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। শহীদ ও আহতদের পরিবারের আগ্রহী সদস্যদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি করে তাদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পাশাপাশি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তরের হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেও সরকার কাজ করছে।
লে. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, জুলাই আন্দোলন আমি সরাসরি দেখিনি। আমি তখন অন্ধকার জগতে ছিলাম। পরে ভিডিওতে দেখেছি, মানুষের কাছ থেকে শুনেছি। জুলাইয়ে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। যারা আহত হয়ে এখনো বেঁচে আছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তাদের এই ত্যাগ না হলে আমি হয়তো ২ হাজার ৯০৮ দিন বা ৬৩ হাজার ঘণ্টার অন্ধকার ঘর থেকে বের হতে পারতাম না।
অনুষ্ঠানে রাওয়া সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম এ হক বলেন, দেশের ইতিহাস এবং জুলাই অভ্যুত্থানে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কখনোই ভুলে যাওয়া বা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কয়েকজন ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা উচিত নয়। তিনি অনুষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি জুলাইয়ের শহীদ ও তাদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মঞ্চ নয়।
অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের উপস্থাপনায় জানানো হয়, জুলাই অভ্যুত্থানে মোট ১৫ হাজার ৯০৩ জন আহত হন। তাদের মধ্যে ৪৩ জন সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, ১৩৩ জন আংশিক দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং প্রায় ২ হাজার জন কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। ৮৬৫টি শহীদ পরিবার ও ৯ হাজার ৫৯৩ জন আহতের সহায়তায় মোট ৩৮৩ কোটি টাকা প্রয়োজন।
এ পর্যন্ত সরকারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ১২০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১০০ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ৮৩১টি শহীদ পরিবার ও ৮ হাজার ১১৭ জন আহতের মধ্যে ১১৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ৩৪টি শহীদ পরিবার ও ১ হাজার ৪৭৬ জন আহতকে সহায়তার জন্য আরও ২৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন।



