র‍্যাব বিলুপ্ত, আসছে এসআরবি

এপ্রিল-মার্চ হচ্ছে দেশের নতুন অর্থবছর

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের প্রচলিত অর্থবছরের সময়সীমাও পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হবে ১ এপ্রিল এবং শেষ হবে ৩১ মার্চ।

সোমবার (১৭ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ-সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

র‍্যাববের জায়গায় এসআরবি

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, র‍্যাবের পরিবর্তে পুলিশের অধীনে এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হবে। প্রস্তাবিত আইনে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ গুরুতর অপরাধ দমন এবং বিশেষ ধরনের অপরাধ তদন্তের দায়িত্ব এসআরবিকে দেওয়ার কথা রয়েছে।

এসআরবির নেতৃত্বে থাকবেন অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক। এর সদর দপ্তর ঢাকায় রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন গঠনের সুযোগ থাকবে।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, শুধু পুলিশ নয়—অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকেও সদস্য প্রেষণে এনে এসআরবিতে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

র‍্যাবের সক্ষমতা থাকবে, বদলাবে কাঠামো

নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে র‍্যাবের বিদ্যমান বিশেষায়িত সক্ষমতা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাচ্ছে না; বরং নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় তা ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খসড়া আইন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে র‌্যাবের জনবল, সম্পদ, স্থাপনা ও চলমান কার্যক্রম নতুন কাঠামোর অধীনে স্থানান্তরের বিষয়ও উঠে এসেছে।

নতুন ইউনিটে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নাগরিক অভিযোগ প্রতিকার কমিটি রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এসআরবির কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, হয়রানি বা অন্যায় আচরণের অভিযোগ থাকলে নাগরিকরা এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে পারবেন।

তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার আগে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন ও পাসসহ প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাৎ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই র‌্যাবের পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না।

কেন র‍্যাবের পরিবর্তন

প্রতিষ্ঠার পর থেকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে র‌্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানা অভিযোগে দেশি-বিদেশি পর্যায়ে বাহিনীটি সমালোচিত হয়েছে।

র‌্যাবের পরিবর্তে নতুন কাঠামো গঠনের উদ্যোগে এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জবাবদিহি ও নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।


২০২৮-২৯ থেকে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর

র‍্যাবের কাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই এবং শেষ হয় পরবর্তী বছরের ৩০ জুন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে তা পরিবর্তন করে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করা হবে।

তবে পরিবর্তনটি এক ধাপে কার্যকর হবে না। রূপান্তরের অংশ হিসেবে ২০২৭-২৮ অর্থবছর নয় মাসের হবে। ওই অর্থবছর শুরু হবে ২০২৭ সালের জুলাইয়ে এবং শেষ হবে ২০২৮ সালের মার্চে। এরপর ২০২৮ সালের ১ এপ্রিল থেকে শুরু হবে নতুন নিয়মের প্রথম পূর্ণ অর্থবছর।

বর্ষাকালের উন্নয়নকাজ সামনে রেখে পরিবর্তন

অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে বর্ষাকালে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে।

বর্তমান জুলাই-জুন অর্থবছরে এপ্রিল থেকে জুন হচ্ছে অর্থবছরের শেষ তিন মাস। এ সময় দেশে বর্ষা শুরু হওয়ায় বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নকাজে সমস্যা তৈরি হয়। একই সঙ্গে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে অনেক প্রকল্পে তড়িঘড়ি কাজ করার অভিযোগ রয়েছে।

নতুন এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলে অর্থবছরের শেষ তিন মাস হবে জানুয়ারি থেকে মার্চ। ফলে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে বলে সরকার মনে করছে।

বদলাতে হবে বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাও

অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বাজেট প্রণয়নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরকারি হিসাব, রাজস্ব আদায়, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা, বাজেট সফটওয়্যার, বার্ষিক প্রতিবেদন, উন্নয়ন প্রকল্পের সময়সূচি এবং সরকারি অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

বিশেষ করে বর্তমানে যেসব প্রকল্পের মেয়াদ জুলাই-জুন অর্থবছর ধরে পরিকল্পনা করা হয়, সেগুলোর সময়সূচি নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষায়িত বাহিনীর কাঠামো বদলাবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রচলিত ক্যালেন্ডারেও বড় পরিবর্তন আসবে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments