চরম সংকটে চা শিল্প

সংকট কাটাতে আড়াই হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব

দেশের সম্ভাবনাময় চা-শিল্প দীর্ঘদিনের লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ সুদ, রপ্তানি কমে যাওয়া এবং শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে বিরোধসহ নানা সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে শিল্পটিকে ঘুরে দাঁড় করাতে আড়াই হাজার কোটি টাকার ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে চা-শিল্প নিয়ে গঠিত টাস্কফোর্স।

এই তহবিলের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পুনর্গঠন, চা পুনরোপণের জন্য গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ এবং কারখানা আধুনিকায়নে সাত বছর মেয়াদি অর্থায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি চা-বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিভুক্ত করে কম সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

চা-শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে চা বিক্রি হওয়ায় বাগান মালিকদের লোকসান বাড়ছে। ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে গড়ে ২৬০ টাকা ব্যয় হলেও নিলামে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২০৮ টাকা ৮৮ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে লোকসান হয়েছে প্রায় ৫১ টাকা ১২ পয়সা।

অন্যদিকে গত এক দশকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু সেই অনুপাতে নিলামমূল্য বাড়েনি। ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছরই উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে চা বিক্রি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।

শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে অসন্তোষ

চা-শিল্পের সংকটের অন্যতম কারণ শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন ও কর্মবিরতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

বর্তমানে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৯৬ টাকা ৩৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো এই মজুরি বাড়িয়ে অন্তত ৫০০ টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছে।

সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া চা-বাগানে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। শ্রমিক নেতারা বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর এবং এই ভূখণ্ডে চা-শিল্পের প্রায় ১৮৫ বছরের ইতিহাসের পরও অনেক চা শ্রমিক ভূমিহীন ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

চা শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, বর্তমান মজুরি দিয়ে উচ্চমূল্যের বাজারে একটি পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। তাঁরা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

উৎপাদন বাড়ার আশা

সংকটের মধ্যেও চলতি বছর চা উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের পরিচালক (পিডিইউ) ড. একেএম রফিকুল হক বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ চা-বাগানের অবস্থা আগের তুলনায় ভালো। অনুকূল আবহাওয়া ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণে চলতি বছর গত বছরের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি চা উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

চলতি বছর চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি নির্ধারণ করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, চায়ের গুণগত মান ও উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চা-শিল্পের উন্নয়নে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টদের জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে।

চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত চায়ের ন্যূনতম নিলামমূল্য প্রতি কেজি ২৪৫ টাকা। গত মাসে নিলামে প্রতি কেজি চায়ের দাম ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, এর সঙ্গে ভ্যাট ও করসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ায় প্রকৃত ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

কমেছে রপ্তানি, বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়

বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৫ সালে দেশের ১৭২টি চা-বাগান থেকে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এই খাতে সরাসরি প্রায় ১ লাখ ২ হাজার স্থায়ী এবং ৪০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন।

তবে রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান দুর্বল। ২০০২ সালের পর থেকে চা রপ্তানি প্রায় ৭৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের চায়ের উৎপাদন ব্যয় বেশি হলেও নিলামমূল্য সে অনুযায়ী বাড়ছে না। ফলে বাগান মালিকদের লোকসান বাড়ছে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

চা-বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিভুক্তির সুপারিশ

চলতি বছরের জুনের প্রথমার্ধে ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স চা-বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।

এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে প্রায় ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদের পরিবর্তে মাত্র ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। টাস্কফোর্সের মতে, এতে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা চা-শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।

টাস্কফোর্স আড়াই হাজার কোটি টাকার ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই তহবিল থেকে চা-বাগানগুলোর ঋণ পুনর্গঠন, নতুন করে চা-গাছ রোপণ এবং কারখানা আধুনিকায়নে অর্থায়ন করা হবে।

জাতীয় চা পুনরোপণ মহাপরিকল্পনা

প্রতিটি চা-বাগানের জন্য ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতি বছর একটি বাগানের ২ থেকে ৩ শতাংশ চা-গাছ প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া চায়ের রপ্তানি পুনরুজ্জীবিত করতে পাকিস্তান, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি প্রণোদনা ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও রয়েছে।

চা-শিল্পকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অগ্রাধিকার খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং একটি পৃথক ‘টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক’ গঠনের সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স।

‘টি গ্রিন ফাইন্যান্স ফ্যাসিলিটি’ গঠনের প্রস্তাব

চা-বাগানে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি জ্বালানি সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থা এবং কারখানা আধুনিকায়নের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ‘টি গ্রিন ফাইন্যান্স ফ্যাসিলিটি’ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।

পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র চা-চাষিদের সহায়তায় পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি স্থায়ী আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ৮ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র চা-চাষিকে কারিগরি সহায়তা ও মানোন্নয়ন সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

শ্রমিক কল্যাণেও একাধিক সুপারিশ

টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যালয়, কার্যকর ডিসপেনসারি, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং চা-বাগানের সড়ক উন্নয়নের বিষয় রয়েছে।

এ ছাড়া চা-বাগানগুলোর সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ৯০ দিনের একটি পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।

৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণের প্রস্তাব

চা-শিল্পের আর্থিক সংকট কাটাতে প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে তথ্য যাচাই ও আর্থিক সহায়তার যোগ্যতা নির্ধারণে আন্তমন্ত্রণালয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।

পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে চা-বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিভুক্ত, ভ্যাট ও ট্যাক্স সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর কথা বলা হয়েছে।

৯০ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত, বিডায় ‘টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক’ চালু, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শুরু এবং পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

‘আয় না বাড়লে শ্রমিক কল্যাণ সম্ভব নয়’

চা-শিল্প টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক মামুন রশীদ বলেন, নতুন চারা রোপণ এবং সৌরবিদ্যুতের সুবিধা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তবে চা কোম্পানিগুলোর আয় না বাড়লে শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

চা-শিল্পের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, বাগানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে সমাধান করা না গেলে দেশের ঐতিহ্যবাহী চা-শিল্পের সংকট আরও গভীর হতে পারে।

তাঁদের মতে, আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত সহায়তা তহবিল, কম সুদের ঋণ, বাগান পুনরোপণ, কারখানা আধুনিকায়ন এবং নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে দেশের চা-শিল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments