সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেন এবং বিদেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলমান একটি অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন এ অভিযোগ যুক্ত করে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজীর আহমেদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে নতুন করে একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগটি দুদকের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তানজীর আহমেদ বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের সময় উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনসহ বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস ও গাড়ি ব্যবহারের মতো বিষয় রয়েছে।
দুদকের কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগের পাশাপাশি বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা ও অন্যান্য সম্পদ কেনা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে। দুই বোনজামাই ও ভাগনের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও অনুসন্ধানে রয়েছে বলে দুদক জানিয়েছে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
এদিকে, দুদকের বক্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন আসিফ মাহমুদ। তিনি অভিযোগ করেন, তদন্তে বিদেশে কিছু পাওয়া গেলে তাকে মাত্র ১০ শতাংশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে চলতে কষ্ট পাচ্ছেন—এমন মন্তব্য করেন।
এর আগে দুদকের বক্তব্যে আপত্তি জানিয়ে আসিফ মাহমুদ প্রাথমিক সত্যতার দাবি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত বুধবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
পরে তাঁর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালকের কাছে আইনি নোটিশ পাঠান। গত বৃহস্পতিবার পাঠানো ওই নোটিশে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
গত শুক্রবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন, গত ২ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের কর্মকর্তা আখতারুল ইসলাম বদলি, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
আসিফ মাহমুদের অভিযোগ, কোনো তদন্তের ফলাফল বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের আগেই দুদকের কর্মকর্তার বক্তব্যের কারণে তাকে নিয়ে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়েছে। এতে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে—এমন ধারণা জনমনে তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে দুদক বলছে, অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা, অর্থের উৎস, লেনদেন ও সম্পদের বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করা হবে।



