খেজুর-শসা-সিগারেটে মিলল দুই আসামির ডিএনএ

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ একই পরিবারের চার খুন

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা কামড় দেওয়া খেজুর, শসা, সিগারেটের অংশ ও খেজুরের বিচির নমুনায় তাদের ডিএনএর সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। এতে চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আলামত যুক্ত হলো।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী। তিনি জানান, দুই আসামির ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য গত ২১ সেপ্টেম্বর তাদের রংপুর কারাগার থেকে ঢাকায় সিআইডি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন আলামতের নমুনার সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চার হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে বিপুলসংখ্যক আলামত সংগ্রহ করা হয়। এসব আলামতের মধ্যে ছিল সিগারেটের অংশ, খেজুর, শসা, ফল কাটার চাকু, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম, বেসিনের দাগ, নান রুটি এবং নিহত শিশু প্রিয়ম চক্রবর্তীর খাতায় পাওয়া একটি লেখা। মোট অন্তত ৩৫টি আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।

ঘটনার প্রায় ১২ দিন পর তিন দফায় এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। এর একটি অংশ ঢাকার সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষার মধ্যে খাদ্যদ্রব্য ও ধূমপানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু আলামতে দুই আসামির ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে।

ঘটনার পর থেকেই ঘটনাস্থলে পাওয়া কামড় দেওয়া শসা ও খেজুরের বিচি তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, হত্যাকাণ্ডের পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ কিছু সময় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। এ সময় তারা গোসল করেন এবং ঘরের ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া যায়। পরে তারা বাড়ির বিভিন্ন কক্ষ তছনছ করে টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় বলে পুলিশের দাবি।

ঘটনার সঙ্গে দুই আসামির সংশ্লিষ্টতা যাচাই করতে তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় তদন্তকারী সংস্থা। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নমুনা সংগ্রহের জন্য তাদের ঢাকায় নেওয়া হয়। তখন তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসি ডিবি জিনাত আলী জানিয়েছিলেন, ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুই আসামির সংশ্লিষ্টতা আরও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা হবে।

এর আগে গ্রেপ্তারের নয় দিন পর মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের ডোপ টেস্ট করা হয়েছিল। তবে ওই পরীক্ষায় তাদের শরীরে মাদক সেবনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পরে তদন্তকারীরা জবানবন্দির তথ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নেন।

তদন্তের শুরুতে পুলিশ জানিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডের আগে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের অবস্থান এবং সেখানে ইয়াবা সেবন নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। পরে চারজনকে হত্যার পর বাড়ির ভেতরে অবস্থান, বিভিন্ন কক্ষ তছনছ এবং স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার তথ্যও তদন্তে সামনে আসে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন করে পাওয়া ডিএনএ মিল মামলার ফরেনসিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে ঘটনাস্থলে পাওয়া খাদ্যদ্রব্য ও ধূমপানের আলামতে দুই আসামির ডিএনএ পাওয়া যাওয়াকে তাদের ঘটনাস্থলে উপস্থিতি ও ঘটনার সঙ্গে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে তদন্তসংশ্লিষ্টরা ডিএনএ মেলাকে এককভাবে চূড়ান্ত অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না। আদালতে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি আসামিদের জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের অন্যান্য আলামত, লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারের তথ্য এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য প্রমাণও বিবেচনায় আসবে।

গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুই দিন যোগাযোগ না হওয়া এবং বাড়ি থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার পর স্বজনরা বিষয়টি জানতে পারেন। পরে পুলিশ গিয়ে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

পুলিশের তদন্তে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যার তথ্য উঠে আসে। পরে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়।

রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে সপরিবারে হত্যার ঘটনায় শুরু থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছেন। নতুন ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ এগোলেও হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদঘাটনে তদন্তের অন্যান্য দিকও যাচাই করা হচ্ছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments