এখনকার সময়ে অ্যালামনাই সংগঠনের পাশাপাশি এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স ও মাস্টার্স পাসের সাল ধরে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি হয়েছে। গ্রুপগুলোতে শিক্ষাজীবনের নানা স্মৃতি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা হয়। অনেকেই এসব আলোচনা, মন্তব্য, ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে আনন্দে মেতে ওঠেন। নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেন। বুকের মধ্যে পাথরের মতো জমে থাকা চাপও অনেকটা কমে আসে।
কিন্তু এমন কোনো বন্ধু কি নেই, যার সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন থেকে বের হওয়ার পর আর কারও দেখা হয়নি? এভাবে কেটে গেছে কয়েক যুগ। তারপর একদিন রংপুর থেকে রুমা উত্তরা তার বান্ধবী তমার সঙ্গে যোগাযোগ করল। রুমা বলে ফেলল, একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে প্রাথমিক স্কুলের যেসব বন্ধু এখনো যোগাযোগের বাইরে, প্রত্যেককে যুক্ত করো।

বলা শেষ। তমা একটা গ্রুপ খুলে নাম দিল ‘প্রাইমারি স্কুল কিউ এ মেমোরিয়াল ফ্রেন্ডস’। একে একে যুক্ত হতে লাগল বন্ধুরা। ফিরোজ, রুমা, রুনা, জুয়েল, সাইরাস, বকুল, ইলা, সিপু, জাহাঙ্গীর, শেলী, রাশেদ, মুন্নী, জাকারিয়া, সূচনা—এভাবে ১৭ জন যুক্ত হয়ে গেল।
শুরু হলো কথোপকথন। কে কেমন দেখতে, কে মোটা হয়েছে, কে চিকন হয়েছে, কাউকে কাউকে চিনতেই পারছে না কেউ। স্কুলে চানাচুর খাওয়া, গোল্লাছুট খেলা, বটতলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচ-গান—কোনো কিছুই বাদ রইল না আলোচনা থেকে।
একসময় এই স্কুলটি রংপুর শহরে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ছিল। স্কুলের হেডস্যার মাসুম স্যারের বেত্রাঘাত কে খায়নি! হ্যাঁ, মনে পড়ে। একমাত্র তমা খায়নি। তাই সবাই তমার প্রতি হিংসুটে ছিল। ও কেন এত পড়তে পারে? না, না, এটা হতে পারে না! কিন্তু মাসুম স্যার, সাদেক স্যার, রণজিৎ স্যার, ছোট আপা, বড় আপা—সব শিক্ষকেরই প্রিয় ছিল তমা। পছন্দ করার কারণও ছিল।
এসব নিয়েই গ্রুপে চলতে থাকল আলোচনা। রুমা তাই প্রস্তাব দিল, আসছে শুক্রবার সে রংপুর থেকে ঢাকায় আসবে। শনিবার উত্তরায় ৩৯ বছর আগের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে আবার পরিচিত হবে।
বাহ! প্রস্তাব পাস হয়ে গেল। কেউ আসবে মেয়েকে নিয়ে, কেউ আবার অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আসবে। তবে সবাই আসতে চায়। দেখতে চায় প্রাণের বন্ধুদের, মনের বন্ধুদের। এই দেখা হতেই হবে।
হৃদয়ের সঙ্গে এই বন্ধন ভালোবাসার কোনো সাধারণ বন্ধন নয়। এ যেন ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন। তাই সবাই উত্তরার খাজা গরীবে নেওয়াজ অ্যাভিনিউয়ের একটি রেস্তোরাঁয় সাজবিকেলে মিলিত হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল।
কে কে আসছে? কে কে পথে? ঢং ঢং ঢং! হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ সরগরম।
ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীরের গাড়ি নষ্ট। তাই মেট্রোরেলে চেপে বসেছে। সে কথা শুনে সিপুও মেট্রোরেলে চেপে বসল। একই ট্রেনে দুজন, দুই বগিতে। মুঠোফোনে কথা হচ্ছে।
—তুই কি মেয়েদের বগির পেছনের বগিতে?
—না, না। আমি মাঝামাঝি বগিতে।
মিনিট বিশেক পর উত্তরা উত্তর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দুই বন্ধুর দেখা। র্যাপিড কার্ড গেটবক্সে দিতেই জানিয়ে দিল, ব্যালান্স কম। কিন্তু জাহাঙ্গীরের মানিব্যাগ নেই। মানিব্যাগ গাড়িতে। তাই সিপু কাউন্টারে কাগুজে নোট দিল।
ঢং ঢং ঢং! কে কোথায়? আমি আর রুনা পৌঁছে গেছি। তমার চিৎকারের মতো মন্তব্য। তমা অবশ্য একটু বেশি ক্রেজি, আর আবেগী। ওর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ একটা আলাদা টান আছে।
জুয়েল কোথায়? বকুল কোথায়? বকুলকে ফোন করেও তমা পেল না। হয়তো বকুল ফোন ধরেনি। কিন্তু জামিউল (সিপু) ফোন দিতেই বকুল ধরল।
—বুঝেছি। আমি আসছি। লোকেশন তো ওটাই!
ব্যস! সিপু রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই তমার সঙ্গে করমর্দন। বাকিরা রুমা, জিমি, শেলী, ফিরোজ।
ফিরোজের আদরের বাবু ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। হাসপাতালে বেডে আদরের বাবাটাকে রেখে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে সে। এরই মধ্যে হাজির হলো নীল রঙের একটি কেক। কেকের গায়ে লেখা, ‘৩৯ বছর পর হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের খোঁজে’। শেলীর নিজের হাতে বানানো কেকটি অসাধারণ!
এরই মধ্যে চাপাইনবাবগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষ করে দ্রুত চলে এল জুয়েল। জার্নি করার ক্লান্তিতে তাকে কিছুটা বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। একটু পর রুমা ও শেলীর মেয়েদের সঙ্গে পরিচয়পর্ব শেষ হলো। এবার কেক কাটার পালা।
তার আগেই রংপুর থেকে চলে এল রুনা। ঘাড়ের ঝোলা থেকে প্লাস্টিকের বড় বড় বাক্স বের করল। মিষ্টি, জর্দা, লাড্ডু—আরও কত কী! সব নিজের হাতে তৈরি করে নিয়ে এসেছে সে।
এরই মধ্যে শিবলী ও বকুল চলে এল। ফিরোজ চলে গেল তার অসুস্থ বাবাটার কাছে। বকুল ডাক্তার দেখাতে যাবে ধানমন্ডিতে। বাইরে সড়কে গাড়িতে বসে আছে তার মিষ্টি বউ আর আদরের বাচ্চা।
যাই হোক, দেখতে দেখতে অল্প সময়ের মধ্যেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হলো। আমরাও আলো-আঁধারির খেলায় নিজেদের স্মৃতি নিয়ে টানাটানি, কাটাকাটি শুরু করলাম। সবাই মিলে একটু নাশতা সারলাম। ফটোসেশন, সেলফি—কত কী!
বকুল বিদায় নিল। এবার সবার বিদায়ের পালা। কে যার বউ-বাচ্চা-স্বামীর পরিচয় তুলে ধরল। আমরা সবাই আরও কিছুক্ষণ সময় নিয়ে স্মৃতি ভাগাভাগি করলাম।
এভাবেই ফিরে পেলাম ৩৯ বছর আগের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের।



