কৃষ্ণপ্রেমে মন মজেছে

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে পদ্মাপাড়ে গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী গৌরাঙ্গবাড়ি। ভারত উপমহাদেশের বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত এ স্থান। ১৫৮১-৮২ খ্রিষ্টাব্দে এখানে মন্দির নির্মাণ ও যে মহোৎসবের সূচনা হয়েছিল, তা এখনো চলমান।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে প্রেমতলীর গৌরাঙ্গবাড়িতে শুরু হয়েছে সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের মহান সাধক ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব মহোৎসব। ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবে দেশ-বিদেশের হাজারো ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে পদ্মাপাড়ের খেতুরীধাম। একসময় এ উৎসবে ভক্তের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যেত। তবে নানা কারণে এখন ভক্তের সংখ্যা কমেছে।

তিন দিনব্যাপী এ মহোৎসবের প্রথম দিন ভজন-কীর্তন, সন্ধ্যা আরতি, দামোদর আরতি, নরোত্তম চরিতকথা ও অধিবাস কীর্তনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। গতকাল শুক্রবার দ্বিতীয় দিন ভোর থেকে মঙ্গল আরতি, হরিনাম সংকীর্তন, খেতুরীধাম পরিক্রমা, দর্শন আরতি ও শ্রীল প্রভুপাদ গুরুপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা অষ্টপ্রহর কীর্তন, প্রসাদ গ্রহণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে অংশ নেন। আজ শনিবার গঙ্গাস্নান ও দীর্ঘ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মহোৎসব শেষ হবে।

খেতুরীধাম ট্রাস্টের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল জানান, সারা পৃথিবীতে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ছয়টি ‘ধাম’-এর পাঁচটিই ভারতে, একটি বাংলাদেশের খেতুরীধামে। এ কারণে খেতুরীধামে দেশ-বিদেশের হাজারো ভক্তের সমাগম ঘটে। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার শ্রীধাম মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দিরে ফাল্গুনের দোল পূর্ণিমায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর তিরোধান তিথি উপলক্ষে সারা ভারতের বৃহত্তম বৈষ্ণব মেলা বসে। এর পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈষ্ণব মেলা বসে রাজশাহীর প্রেমতলীর খেতুরীধামে।

তার ভাষ্য, খেতুরীধামের তমালবৃক্ষের নিচে পদ্মা নদীতে শ্রীচৈতন্যদেব স্নান করেছিলেন বলে তীর্থযাত্রীরা ওই স্থানে স্নান করে খেতুরী মন্দির দর্শনে যান। কাছেই শ্রীনরোত্তম ঠাকুরের ‘ভজনস্থলী’ রয়েছে। সেখানে গিয়ে ভক্তরা মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন। তবে ভোজনালয়ের চিহ্ন এখন আর নেই।

ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ভক্তদের প্রসাদ, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও মন্দিরের সংযোগ সড়কে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় ট্রাস্ট বোর্ড সুষ্ঠুভাবে মহোৎসব সম্পন্ন করছে।

গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজন মিয়া বলেন, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা উৎসবে আগত ভক্তদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিচ্ছেন। ভক্তদের নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার পালনে প্রশাসন ও পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

গোদাগাড়ীর ইউএনও ইসরাত জাহান বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।

খেতুরীধামের ইতিহাস

ভক্তদের বর্ণনা অনুযায়ী, শ্রীনরোত্তম ঠাকুরের তিরোভাব তিথি কার্তিকের লক্ষ্মীপূর্নিমার প্রতিমা বিসর্জনের নবম দিনে, কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থ তিথিতে অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। পঞ্চমীতে অষ্টপ্রহর, নামসংকীর্তন, পরদিন দধিমঙ্গল। দেশ-বিদেশের হাজারো শুদ্ধব্রত বৈষ্ণব নারী-পুরুষ ও লালবসনের সংসারবিরাগী ব্রহ্মচারী হাড়ি-কুড়ি, চাল-ডাল পোটলায় এনে তিন দিন অবস্থান করেন গৌরাঙ্গবাড়িতে। খেতুরীধামে ধর্মসভা, পদাবলি কীর্তন, নগরসংকীর্তন ও প্রসাদ বিতরণ চলে। মেলায় মিঠাই-মণ্ডাসহ সব ধরনের গৃহস্থালি পণ্যও মেলে।

ভক্তদের বিশ্বাস, কলির কৃষ্ণ নিমাই সন্ন্যাসী শ্রীনরোত্তম দাস ঠাকুরের জন্য শ্রীকৃষ্ণের প্রেমধন নিয়ে এসেছিলেন আজকের গোদাগাড়ী, তথা তৎকালীন গৌড় পরগনার অন্তর্গত রাজা কৃষ্ণনন্দ দত্তের রাজ্য পদ্মার তীরে। গোপনে রেখে গিয়েছিলেন প্রেমধন তমালবৃক্ষের নিচে। প্রেমভরে সেই শিশুকে ডেকেছিলেন ‘নরা-নরা’ বলে। সেই ‘নরা’ পরে ১৫৩১ থেকে ১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক মাঘী পূর্ণিমার গোধূলিলগ্নে কিংবা পঞ্চমীতে খেতুরীধামের রাজা শ্রীকৃষ্ণানন্দ দাস ও শ্রীমতী নারায়ণী দেবীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন।

ছোটবেলায়ই শ্রীনরোত্তম ছিলেন ভাবুক। রাজপুত্র হিসেবে রাজসিংহাসনে বসার কথা থাকলেও সংসার ও ভোগবিলাসের প্রতি ক্রমেই উদাসীন হয়ে পড়েন তিনি। এমন সময় খেতুরীতে আগত এক ব্রাহ্মণ নবদ্বীপে শ্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাবের কথা বলেন। ব্রাহ্মণ আরও বলেন, শ্রীগৌরাঙ্গ বৃন্দাবনে যাবেন বলে লাখ লাখ লোক সমবেত হয়ে নৃত্য করতে করতে পদ্মার অপর প্রান্তে আসেন। তাই তিনি পদ্মার পাড়ে তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকতেন। ভাবতেন, এই বুঝি শ্রীগৌরাঙ্গ হরিবোল ধ্বনিতে ঝংকার তুলে নৃত্যের তালে এসে পড়বেন।

প্রচলিত আছে, একদিন শ্রীনরোত্তম পদ্মায় স্নান করতে গিয়ে আর বাড়ি ফিরলেন না। রাজপরিবার কোথাও তার খোঁজ পেল না। পরে পিতাসহ অনেকে দেখলেন, একটি বালক পদ্মার ধারে নৃত্য করছে। তবে কেউ বালকটিকে চিনলেন না। পুত্র পদ্মায় ডুবে মারা গেছে ভেবে সবাই মা নারায়ণী দেবীকে স্থির ধারণা দিলেন। কিন্তু অস্থির নারায়ণী দেবী ‘নরা-নরা’ কাঁদতে লাগলেন।

বাহ্যজ্ঞানশূন্য ওই বালক ‘নরা’ ডাক শুনে কণ্ঠকিত সম্বিত ফিরে দৌড়ে এসে নারায়ণী দেবীর কোলে বসে বলল, ‘মা তুমি কাঁদছ কেন? এই তো আমি তোমার নরা।’ সমবেত লোকজন বালকের মুখপানে নিরীক্ষণ করে আশ্বস্ত হলেন, হ্যাঁ, এ বালকই নরা। তবে তার গায়ের শ্যামবর্ণ তখন উজ্জ্বল গৌরবর্ণে রূপান্তরিত এবং মনোমধ্যে উক্ষিত ভাবের তরঙ্গবিভাজাতে তার মুখের অবয়ব কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

বাড়িতে ফিরে ‘নরা’ পিতা-মাতাকে বলেন, ‘প্রায় অর্ধচেতন অবস্থায় পদ্মায় স্নান করতে গিয়েছিলাম। স্নান করা মাত্র আমার কী অপরূপ ভাব হলো। দেখলাম, গৌরবর্ণ এক পরম সুন্দর বালক নৃত্য করে কাছে এসে আলিঙ্গন করত, আমার হৃদয়ে প্রবেশ করে নৃত্য করাতে লাগলেন। আর আমি কাঁদতে লাগলাম। তারপর আমার কিছু মনে নেই। অতঃপর তোমার ক্রন্দনধ্বনি ও সমধুর ডাক আমার কানে প্রবেশ করে সম্বিত ফিরল। পদ্মা তখনই বহু কালের (প্রায় ৭০০ বছর) প্রাচীন হিরণ্ময় তমালবৃক্ষ, যা কালের সাক্ষী হয়ে আজও বিদ্যমান। শ্রীনরোত্তম এই পদ্মাস্নানে স্বয়ং দেহধারণ করে তাঁকে শ্রীগৌরাঙ্গ গচ্ছিত প্রেমধন দান করেন।’

তারা জানান, শ্রীনরোত্তম ঠাকুর ১৬ বছর বয়সে বিশাল সম্পদ ও রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে বহু কষ্টে পদব্রজে দুর্গম পথে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরণে আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে নবদ্বীপ-বৃন্দাবন গমন করেন। কিন্তু তার ভাগ্যে তা মেলেনি। ততদিনে শ্রীচৈতন্যদেব বৃন্দাবনে শিষ্য শ্রীলোকনাথ গোস্বামীকে রেখে অন্যত্র গমন করেন। দুই বছর খেদমতের পর শ্রীলোকনাথ গোস্বামী তুষ্ট হয়ে শ্রীনরোত্তমকে দীক্ষা দেন। সেখানে তিনি শ্রীজীব গোস্বামীর নিকট ভক্তিশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।

এরপর গুরুর আদেশে স্বদেশে ফিরে হরিভক্তি প্রচার ও কীর্তনে আত্মনিয়োগ করেন। তার সাধনা-জীবন বৈষ্ণবদের উদ্বুদ্ধ করে। তিনি বাংলার স্তিমিতপ্রায় বৈষ্ণবদের পুনরুজ্জীবন দেন। এভাবেই তিনি কৃষ্ণপ্রেমিক বৈষ্ণব সমাজের প্রেমভক্তির মহারাজ হন। তাঁর অফুরন্ত প্রেমভাণ্ডারের কারণে গোদাগাড়ীর ওই বাসস্থানের নাম হয়েছে প্রেমতলী। প্রায় ৫০০ বছর আগের সেই কাহিনির স্মৃতি আজও বহন করছে খেতুরীধাম।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments