নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণ করল মাইলস্টোন স্কুল

হৃদয়সিক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি, শোক প্রকাশ আর বেদনামথিত স্মৃতি চারণের মাধ্যমে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় শহীদদের স্মরণ করেছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের এক বছরপূর্তির দিন গতকাল নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে শোকসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। শোক সভায় অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও কাঁদেন।

মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনায় নিহতদের রুহের মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনায় মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকাল ১০টায় দুর্ঘটনারস্থল দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনের সামনে স্থাপিত বেদিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। হতাহতদের শ্রদ্ধা জানাতে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সশ্রদ্ধ সালাম জানানো হয়। এসময় শহীদদের স্মরণে পালন করা হয় এক মিনিটের নীরবতা এবং আয়োজন করা হয় দোয়া ও মোনাজাতের।

শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাইলস্টোন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল নুরন নবী (অব.), অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম, কলেজের উপাধ্যক্ষ (প্রশাসন) মোঃ মাসুদ আলম, মাইলস্টোন প্রিপারেটরি কেজি স্কুলের নির্বাহী অধ্যক্ষ মিসেস রিফাত নবী আলম এবং মাইলস্টোন স্কুল ডিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন মো. জাহাঙ্গীর আলম খান (অব.)।

দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান শুরু হয় বেলা ৩টায়। মাইলস্টোন কলেজের ডিয়বাড়ি ক্যাম্পাসের প্রধান সেমিনার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছিলো আলোচনা সভা, হতাহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের স্মৃতিচারণ এবং দোয়া মাহফিল। আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগর (উত্তর) বিএনপি’র সদস্য সচিব মোঃ মোস্তফা জামান এবং মাইলস্টোন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল নুরন নবী (অব.)।

অনুষ্ঠানে দুঃসহ দিনের কথা মনে করে স্মৃতিচারণ করেন বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষিকা মেহেরীন চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল, নিহত শিক্ষার্থী তাসনিয়া হকের পিতা নাজমুল হক, আহত শিক্ষার্থী জাইয়ানা মাহবুব’র মা সানজিদা বেলায়েত এবং আহত শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্তর বাবা মো. মিজানুর রহমান প্রমুখ। অনুষ্ঠানের শেষাংশে অনুষ্ঠিত দোয়ায় নিহতদের জন্য প্রার্থনা এবং আহতদের সুস্থ্যতা কামনা করা হয়।

গতকাল সকালের অনুষ্ঠানে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) নুরন্নবী বলেন, ‘আজ আমরা গভীর শোকের সঙ্গে আমাদের নিহত শিক্ষক, ছোট ছোট শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য প্রাণহানির শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করছি।’ সকালে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে একটি কর্মসূচি থাকায় অনেক অভিভাবক সেখানে অংশ নিয়েছেন। বিকালে অভিভাবকদের নিয়ে আরেকটি স্মরণানুষ্ঠান রয়েছে বলে নুরন্নবী জানান।

স্মৃতিবেদির দুই পাশে নিহত ব্যক্তিদের ছবিসংবলিত দুটি ব্যানার টাঙানো হয়। সেখানে নিহতদের সহপাঠী, শিক্ষক ও স্বজনেরা স্মৃতিচারণামূলক বিভিন্ন বার্তা লিখে শ্রদ্ধা জানান। দিবসটি উপলক্ষে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব শাখায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মোল্লা বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর একের পর এক বিস্ফোরণ হচ্ছিল। ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু পর্যন্ত আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে শিশুদের আর্তচিৎকার শুনে তিনি তাদের উদ্ধারে ছুটে যান। তবে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কিছুটা পেছনে সরে যেতে বাধ্য হন।

মনিরুজ্জামান মোল্লা বলেন, ভবনের ফটকের কাছে এসে তিনি কয়েকটি শিশুর মরদেহ দেখতে পান। সেখানে একজন অভিভাবকের মরদেহও পড়ে ছিল। এ সময় নিজের মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে তিনি শিক্ষক মাহরীন চৌধুরীকে কয়েকটি শিশুকে ঠেলে নিরাপদ স্থানে পাঠাতে দেখেন। তখন মাহরীন চৌধুরীর শরীরে আগুন জ্বলছিল।

মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ম্যাডাম তখন কথা বলতেও পারছিলেন না। পাশে থাকা এক আয়ার নীল ওড়না দিয়ে তাঁর শরীরের আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আগুনের তাপ এত বেশি ছিল যে আমার হাত পুড়ে যায়। ঠিক তখনই পাশে পড়ে থাকা বিমানের লেজের অংশেও বিস্ফোরণ ঘটে। আমি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ওই বিস্ফোরণ থেকে প্রাণে বেঁচে যাই।’

দুর্ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিমানের শব্দ এখনো তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে বলে জানান শিক্ষক মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তান দীর্ঘদিন বিমানের শব্দ শুনে ঘুমাতে পারত না। আমিও দীর্ঘদিন আতঙ্কে ছিলাম। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠনের উদ্যোগে ধীরে ধীরে সেই মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।’ স্কুলের শিক্ষক ফারজানা কাবেরী বলেন, নিহত শিশুরা তাঁদের কাছে নিজেদের সন্তানের মতোই ছিল।

তিনি বলেন, ‘ওদের সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ছোট বাচ্চারা খুব সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নেয়।’ দুর্ঘটনায় নিহত এক শিশুর স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘সেদিন সকালে কোনো কারণ ছাড়াই সে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিছু বলবে? সে শুধু বলেছিল, এমনিই। পরে সেই শিশুই আর ফিরে আসেনি।’

সেদিনের বিভীষিকাময় মুহূর্তের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ফারজানা কাবেরী। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু কালিমা পড়ছিলাম। বাচ্চারা বলছিল, মিস, কিছু করেন, আমাদের বাঁচান। কিন্তু চারদিকে আগুনে ঘেরা ছিল। আমি তাদের বলেছিলাম যেকোনো একদিকে দৌড়াতে। কিন্তু যেদিকেই তাকিয়েছি, আগুনের দেয়াল ছাড়া কিছুই ছিল না।’

যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার যে কারণ উঠে এসেছে তদন্তে: দুর্ঘটনার পর গত বছরের ২৭ জুলাই ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে তৎকালীন অন্তর্র্বতী সরকার। বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় উড়োজাহাজের কারিগরি কোনো ত্রুটি পায়নি কমিশন।

ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় পাইলটের ‘ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি’, গ্রাউন্ড বা কমান্ডিং সুপারভাইজারের ‘তত্ত্বাবধানের অভাব’ এবং ভবন নির্মাণের ‘ত্রুটি’কে মোটা দাগে দায়ী করা হয়েছে কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে। গত বছর ৪ নভেম্বর তখনকার অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ওই প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত কমিশন।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গতকাল সংসদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঘোষিত ক্ষতিপূরণ যেন পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে, সে ব্যাপারে অবশ্যই সরকার কাজ করবে। এটা আমি কনফার্ম করছি এবং যেসব প্রস্তাবনার কথা বলছেন, সেগুলোও নিশ্চয়ই কাজ হবে। কারণ এটা তদন্ত হয়েছে, তদন্তের রিপোর্ট তৈরি হয়েছে এবং রিপোর্টের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই সরকার নেবে।

আর বিশেষ করে আমি আবারও বলছি জোর দিতে চাই-ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলব এবং যেন সেটা দ্রুত পৌঁছে যায়, সেই চেষ্টা নিশ্চয়ই আমরা করব। এবং এটাও একটু দুর্ভাগ্যজনক যে, একটা বর্ষপূর্তিতে এসে আমাদেরকে স্মরণ করতে হচ্ছে-এই পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণ পায়নি। আমি-আমাদেরও দায়িত্বে আসার পাঁচ মাস হয়ে গেছে, এটা আমাদেরও খানিকটা ব্যর্থতা নিশ্চয়ই। আমরা এটা রিকভার করার চেষ্টা করব।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments