উৎপাদনশীলতার মানদন্ডে পিছিয়ে দেশের ৫৬ শতাংশ কৃষি জমি

দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় সাময়িক কিছুটা স্বস্তি থাকলেও, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক বা বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে কৃষি জমির উৎপাদন কমছে এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। সার ও কীটনাশকের অব্যবস্থাপনা মাটির অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর প্রকাশিত ‘উৎপাদনশীল ও টেকসই কৃষি জরিপ-২০২৫ এর ফলাফল অনুযায়ী, দেশের মোট কৃষি জমির ৫৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ তাদের অর্থনৈতিক ও উৎপাদনশীলতার কাঙ্ক্ষিত মানদ- পূরণ হচ্ছে না। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি কৃষি জমি উৎপাদনে পিছিয়ে রয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে।
জরিপে দেখা যায়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে প্রায় ৯৮ দশমিক ৮২ শতাংশ কৃষি পরিবার। তবে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য তাদের পরিবেশ ও টেকসই ব্যবস্থায় নি¤œমুখী। এছাড়াও, জমিতে সুরক্ষিত দখলি অধিকার নিশ্চিত হয়েছে ৮৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ এলাকায়। তবে কৃষি মজুরির হারের দিক থেকে জাতীয় টেকসইতার হার ৬০ দশমিক ১২ শতাংশ, যা এখনও ৪০ শতাংশের কাছাকাছি কৃষি এলাকায় অদক্ষ শ্রমিকরা জাতীয় কৃষি মজুরি হারের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি জমির প্রায় ৭২ দশমিক ৭৫ শতাংশই মাটি ক্ষয়জনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত, যা মাটির স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলছে। অর্থাৎ মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক বা বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে কৃষি জমির উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে উপর ঝুঁকি বাড়ছে।
দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় মনোনিবেশ জরুরি, একই সঙ্গে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে প্রাণ-প্রকৃতি ঠিক রাখার কাজে। মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ার সঙ্গে মাটিতে কিছু ভারী ধাতু থাকে। এগুলো পরবর্তী সময়ে ফসলে চলে আসে। পরিবেশ, মাটি, পানি, বাতাসের কোনো ক্ষতি না করে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করতে পারেন, সেজন্য কিছু নিয়মনীতি তৈরি করাও জরুরি বলে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
তারা আরো বলেন, কীটনাশক আমাদের খাদ্য প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। যা ক্যান্সার সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন কীটনাশক নিষিদ্ধ হলেও দুষ্কৃতকারীরা আবার তা ব্যবহার করছে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
২০২০ সালে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) এর জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭৬ দশমিক ২ শতাংশ বা ১১ দশমিক ২৪ মিলিয়ন হেক্টর জমি মাঝারি থেকে গুরুতর অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। এর প্রধান কারণ রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, এবং শিল্প দূষণ।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দায়িত্বের অবহেলা ও অসেচতনতার কারনে দেশের কৃষি স্থায়িত্ব প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় দেশের কৃষি জমির উৎপাদন ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়বে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২০শে জানুয়ারি থেকে ৫ই মার্চ পর্যন্ত দেশব্যাপী পরিচালিত এই জরিপটি কৃষি ব্যবস্থার অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক-এই তিনটি মাত্রার ওপর ভিত্তি করে ১১টি উপ-নির্দেশক ব্যবহার করে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, সামগ্রিক জাতীয় টেকসইতার হার নির্ধারিত হয়েছে মূলত ‘হেক্টর প্রতি খামার উৎপাদনের মূল্য’ উপ-নির্দেশকের ভিত্তিতে, যা অর্থনৈতিক টেকসইতার মূল মাপকাঠি। এই উপ-নির্দেশকে মাত্র ৪৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ কৃষি জমিকে উৎপাদনশীল ও টেকসই হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। বিপরীতে ৫৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ কৃষি জমিতে কম উৎপাদন হয় বা আশানুরুপ উৎপাদন নেই বলে জরিপে উঠে এসেছে।
দেশের পরিবেশগত দিক থেকে কৃষিতে সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ সার ও কীটনাশকের ব্যবহারের ব্যবস্থাপনা। জরিপে কীটনাশক ব্যবহার এবং ঝুঁকি প্রশমন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে জাতীয় টেকসইতার হার সর্বনি¤œ ৫১ দশমিক ৩৭ শতাংশ দেখা গেছে। যা বিষাক্ত রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এদিকে, মাটির অবক্ষয়ের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে ৭২ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং জল প্রাপ্যতার ভিন্নতা নিয়ন্ত্রণে ৮১ দশমিক ৬৬ শতাংশ টেকসইতার হার পাওয়া গেছে। এছাড়া, কৃষি-জীববৈচিত্র্য সহায়ক অনুশীলন ব্যবহারে টেকসইতার হার ৭১ দশমিক শূণ্য ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ‘রাইস ভিশন ফর বাংলাদেশ: ২০৫০ অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক এক গবেষণাপত্রের তথ্যমতে, ২০৫০ সালে দেশের জনসংখ্যা হবে ২১ কোটি ৫৪ লাখ। তখন প্রতি বছর ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন চালের প্রয়োজন হবে। গবেষণায় বলা হয়, ধান চাষের জমির পরিমাণ না কমলেই কেবল এই চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৪ কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments