‘পুলিশ যেভাবে চায় সেভাবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দাও’ শেখ হাসিনার মামলায় আবু সাঈদের লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের জবানবন্দি

জুলাই আন্দোলনে খুব কাছ থেকেই পুলিশ গুলি করে হত্যা করে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে। যাকে হত্যার মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ধারণ করে। কিন্তু সেই হত্যাকান্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে লাশের ময়না তদন্ত প্রতিবেদন বদলে দিতে ময়না তদন্তকারী চিকিৎসককে চাপ প্রয়োগ করেছিলো রংপুর বিভাগের উর্দ্ধতন পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) একজন চিকিৎসক। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসককে তারা বলেছিলেন, আবু সাঈদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে হেড ইনজুরি লিখ। নইলে তোমার সমস্যা হবে। পুলিশ যেভাবে চায় সেভাবেই রিপোর্ট দাও। কিন্তু ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সেই পথে না হেটে প্রথম ময়না তদন্ত রিপোর্টে মৃত্যুর আসল কারণ উল্লেখ করে লিখেন, বুলেট ও পিলেট ইনজুরির কারনে রক্তক্ষরণ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন আবু সাঈদ। কিন্তু বারবার নানমুখী চাপের কারনে পঞ্চম দফায় গিয়ে তিনি লিখেন পিলেট ইনজুরির কারনে মৃত্যু হয়েছে। তবে গান শট শব্দটি লিখিনি। রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই সাক্ষ্য দিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রাজিবুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আবু সাঈদের হত্যাকান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে দেশ-বিদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। সেখানে পুলিশ খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এখন যদি সেই হত্যার কারন হিসেবে হেড ইনজুরি উল্লেখ করি তাহলে চিকিৎসকরা সমাজ বিশ্বে ঘৃণার পাত্র হতেন। এজন্য চাপের কাছে আমি নতি স্বীকার করিনি। বিচারপতি মো. গোলাম মূর্তজা মজুমদারের নের্তৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে এ সাক্ষ্য দেন ওই চিকিৎসক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন জনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মানবতাবিরোদী অপরাধের এই মামলায় সপ্তম দিনে তিন জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহন করে ট্রাইব্যুনাল। এ নিয়ে ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহন সমাপ্ত হলো। সাক্ষ্যগ্রহনে ট্রাইব্যুনালকে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, বিএম সুলতান মাহমুদ প্রমুখ।
সাক্ষ্যে ডা. রাজিবুল বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাই আমি শহীদ আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত করি। তার শরীরে অনেকগুলো পিলেট পাওয়া যায়। পিলেট বিদ্ধ হয়ে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ জনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে উল্লেখ করি। তবে মতামতসহ আমার করা রিপোর্ট তাজহাট থানার তদন্ত কর্মকর্তাকে দিতে গেলে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট গ্রহণ না করে নতুন করে রিপোর্ট লিখতে বলে। এভাবে তিনবার আমার রিপোর্ট গ্রহণ করা হয়নি। সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ওই বছরের ৩০ জুলাই রংপুর মেডিক্যালের ভাইস প্রিন্সিপালের রুমে রংপুর সিটি এসবির এসপি সিদ্দিক, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি মারুফ, রংপুর মেডিক্যালের স্বাচিপ সভাপতি ড. চন্দন আমাকে তাদের মত করে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দিতে চাপ দেন। এসময় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা রুমের বাইরে অবস্থান করছিলেন। ওনারা প্রথম থেকেই আমাকে বলেন যে, আবু সাঈদের মাথায় ইনজুরি আছে সেটা ফোকাস করতে হবে। তারা আমাকে তাদের মত করে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দিতে চাপ দেন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। তারা আমাকে আবু সাঈদের বুলেট/পিলেট ইনজুরির পরিবর্তে হেড ইনজুরি ও নিউরোজেনিক শক লিখতে বলেন। তারা আমাকে বলেন তাদের মতো পোস্টমর্টেম রিপোর্ট না দিলে আমার বিরুদ্ধে মামলা হবে। আমার বিষয়ে নাকি গোয়েন্দা রিপোর্ট আছে।
ডা. রাজিবুল বলেন, তারা আমাকে সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড ঘুরে আসার প্রলোভন দেন। পাসপোর্ট না থাকার কথা বললে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কক্সবাজারে ঘুরে আসার অফার দেয়। তবে আমি রাজি হইনি। আমি ভাইস প্রিন্সিপাল স্যারকে বলি, স্যার আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার দৃশ্য টিভিতে লাইভ সম্প্রচার হয়েছে এবং তা সারা বিশ্ব দেখেছে। আমি যদি এই হত্যাকে হেড ইনজুরি বলে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেই তাহলে সারা বিশ্বের মানুষ ড. সমাজকে ঘৃণার চোখে দেখবে।
ডা. রাজিবুল বলেন, স্বাচিপের ডা. চন্দন আমাকে বলেন নেত্রী তোমার ব্যাপারে কনসার্ন। পুলিশ যেভাবে চায় সেভাবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দাও। কিন্তু এতকিছুর পরেও আমি আমার জায়গা থেকে সরে যাইনি। সর্বশেষ দেয়া পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আমি আবু সাঈদের শরীরে পিলেট ইনজুরির বর্ণনা দেই। তবে রিপোর্টে ‘গান শর্ট’ শব্দটা লিখিনি। এসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন চিকিৎসক রাজিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী ও দুটি সন্তান আছে। তৎকালীন সরকার এখন ক্ষমতায় থাকলে আমার কি অবস্থা হতো? আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য রিপোর্ট প্রদান করেছি। আমি আবু সাঈদ হত্যার নির্দেশ দাতাসহ জড়িতদের বিচার ও শাস্তি চাই।
ডা. রাজিবুল ছাড়াও ট্রাইব্যুনালে গতকাল সাক্ষ্য দেন রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অফিস সহকারী মো. গিয়াস উদ্দিন ও কুষ্টিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক শরিফুল ইসলাম। সাক্ষ্যগ্রহন শেষে জেরা করেন আসামি পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌসুলি মো. আমির হোসেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments