বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার,জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দেশ ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। বর্তমান সংকট সৃষ্টি করেছে সরকার নিজেই। তারা যে কমিশন বা কমিটি গঠন করেছে, সেখানে গত আট-নয় মাস ধরে নানা সংস্কার ও ঐকমত্যের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ঐকমত্য কমিশনের কয়েকটি বিষয়ে আমরা একমত হতে পারিনি। আমরা নির্বাচনে অংশ নেব এবং আমাদের ইশতেহারে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করব। জনগণ যদি আমাদের ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়, তবে আমরা সেই বিষয়গুলো পুনরায় সামনে নিয়ে আসব এবং সংসদে পাস করিয়ে দেশের পরিবর্তন ঘটাব। তিনি বলেন,আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত করার জন্য একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে। গণভোট নির্বাচনের আগে করার কোনো সুযোগ এখন আর নেই। গণভোট নির্বাচনের দিনই হবে, সে কথা তাঁরা পরিষ্কার করে বলেছেন। সেখানে দুটো ব্যালট থাকবে-একটি গণভোটের জন্য,আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য। যারা গণভোটের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে, দয়া করে তারা যেন জনগণকে আর বিভ্রান্ত না করে। এই দলটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। আজকে দয়া করে জনগণ যে নির্বাচন চায়, সেটার যেন বিরোধিতা তারা না করে।
গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের (আ স ম রব) ৫৩তম প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী অংশীদারত্বের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ মন্তব্য করেন তিনি। আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু,বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক,গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক,বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, জেএসডির স্থায়ী কমিটির সদস্য তৌহিদ হোসেন, জাতীয় যুব পরিষদের সভাপতি এস এম শামসুল আলম নিক্সন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। শারীরিক অসুস্থতার জন্য জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় উপস্থিত হতে পারেননি বলে জানান দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন,যেদিন ঐকমত্যের নথি জমা দেওয়া হলো,মনে আছে, সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল ১৭ তারিখ। তার আগে আবার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। আমরা আবার ঠিকঠাক করে সব রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে বৃষ্টির মধ্যে ছাতা ধরে সেখানে স্বাক্ষর করলাম। কিন্তু যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে সেটা উপস্থাপন করা হলো, তখন দেখা গেল অনেক পার্থক্য। দেখা গেল, যখন সুপারিশ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন উপস্থাপন করল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে, তখন সেটায় অনেক পার্থক্য। বিশেষ করে তাঁরা যে নোট অব ডিসেন্টগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো যেন সুপারিশে উল্লেখ করা হয়, তেমনটা বলেছিলেন। এ ব্যাপারে তাঁরা আস্থা-বিশ্বাস রেখেছিলেন। কিন্তু সেই আস্থা, বিশ্বাসের সঙ্গে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। যেটা তাঁরা তাদের কাছ থেকে আশা করেননি। বিএনপির মহাসচিব বলেন,আমাদের মতভেদ থাকলেও মূল যে সনদ, সেই সনদে আমরা স্বাক্ষর করেছিলাম। এটাই নিয়ম যে, আমরা যদি নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় যাই, মানুষ যদি আমাদের ভোট দেয়, তাহলে আমরা সেই বিষয়গুলো আবার সামনে নিয়ে আসব। সেটাকে আমরা পার্লামেন্টে পাস করে দেশের যে পরিবর্তন, সেই পরিবর্তনটা নিয়ে আসব। বিএনপিকে সংস্কারের বিপক্ষের দল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপির জন্ম হয়েছে সংস্কারের মধ্যে দিয়ে। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে বহুদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ফখরুল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশ যখন একদলীয় শাসনব্যবস্থার জাতাঁকলে, তখন আ স ম আব্দুর রবের মতো রাজনীতিবিদেরা দেশকে উদ্ধার করেছিল। তিনি আ স ম আব্দুর রবের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। আগামীতে নির্বাচিত হলে বিএনপির ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। ভবিষ্যতে যে সরকার নির্বাচন আয়োজন করবে, সেই সরকার যদি প্রতারক হয়, তাহলে আর কী করার আছে। নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের মতো পরিস্থিতি বর্তমানে দেশে নেই। দেশের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো, দ্রুত সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন,আমাদের ইতিহাসের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বারবার আমরা স্বৈরাচারকে সরাই, আবার আমাদের মধ্যে থেকেই স্বৈরাচার জন্ম হয়। তাই ঐতিহাসিকভাবে আমাদের প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমরা ভেবেছিলাম, আমাদের দেশে নতুন রাজনীতির উত্থান হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো,চব্বিশ-পরবর্তী দেশের রাজনীতি বিএনপি ও জামায়াতের দ্বিদলীয় রাজনীতিতে আবদ্ধ করার চেষ্টা করছে।’
নুরুল হক বলেন,আজকে যে গণভোটের দাবিটা তোলা হচ্ছে, ডিসেম্বরে যদি জাতীয় নির্বাচনের তফসিল হয়, সময় আছে এক মাস, এই সময়ে কি আরেকটা নির্বাচন সম্ভব?



