শহীদ মেজর মিজানুর রহমানের মা কোহিনূর বেগম। তাঁর বয়স প্রায় ৭৫ বছর। তিনি পরিবারের সদস্যদের সহায়তা হুইল চেয়ারে চেপে এসেছেন ছেলের সমাধিস্থলে। বনানী সামরিক কবরস্থানের ৭ নম্বর ব্লকের ৬৪২ নম্বর কবরটি শহীদ মেজর মিজানুর রহমানের। এর পাশেই বসে আছেন মা কোহিনূরসহ অন্য স্বজনরা।

সমাধিস্থলের মাটি ছুয়ে তিনি বলেন, “এটাই হয়তো আমার শেষবারের মতো আসা। সামনের বছর বেঁচে থাকব কী না জানি না, আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা (ছেলে)।” এক পর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কবর ধরে কাঁদতে থাকলেন। পাশেই বেদনার্ত, অশ্রুসিক্ত চোখে শহীদ মিজানুর রহমানের ছেলে তেহসীন রহমান সামি নতুন সরকারের কাছে তার বাবা ও অন্য শহীদদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জানান।
রক্তে ভেজা সেই ২৫ ফেব্রুয়ারির স্মৃতি আজও শুকায়নি। ২০০৯ সালের সেই রক্তাক্ত সকাল আজও শোকের কালো ছায়া হয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতি বুকে নিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও বনানীর সামরিক কবরস্থানে জড়ো হয়েছেন শোকাহত পরিবারগুলো। বয়সের ভার, অসুস্থতা কিংবা দূরত্ব-কিছুই থামাতে পারেনি তাদের।
কারণ সন্তানের, স্বামীর কিংবা ভাই ও বাবার কবরের সামনে দাঁড়ানোই যেন তাদের শেষ সান্ত্বনা। বৃদ্ধ বাবা-মা, সঙ্গে প্রিয়তমা স্ত্রী ও আদরের সন্তানদের অশ্রুজলে উচ্চারিত হয়েছে নীরব দোয়া। কাঁপা কাঁপা হাতে প্রিয়জনের কবর ছুঁয়ে তারা শুধু বিচার, মর্যাদা আর স্মৃতির সম্মানটুকু চেয়েছেন। জাতির মেধাবী সন্তানদের স্মরণ করতে গিয়ে সবারই আক্ষেপ, বিচারের রায় কবে কার্যকর হবে? পিলখানা হত্যাকান্ডের নেপথ্যে কী, কারা জড়িত-এসবের প্রশ্নের উত্তর তাঁরা খুঁজছেন।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা অথবা মায়েরাও হুইলচেয়ারে ভর করে ছুটে আসেন সন্তানের সমাধিস্থলে। কারণ তাদের কারো কারো কাছে এই সমাধিস্থলই হয়তো এবারই শেষ দেখা, শেষ স্পর্শ, শেষ আশ্রয়। হয়তো আগামী বছর আর আসা হবে না আদরের সন্তানের কবর ছুঁয়ে দেখা, স্পর্শ করা। তার জন্য দোয়া করা।

শহীদ কর্নেল কুদরত এলাহীর সন্তান অ্যাডভোকেট সাকিব রহমান বলেন, ‘গত বছর জাতীয় শহীদ সেনা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এবার আমরা মনে করি আরো মর্যাদা দিয়ে দিনটি পালন করা হচ্ছে, যেহেতু রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। ফলে আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ করছি।
বিচারের দাবি জানিয়ে সাকিব বলেন, গত বছরের নভেম্বরে তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এখন বিএনপি সরকারের অন্যতম কাজ হবে তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের যেন বিচারের আওতায় আনা হয়। তাহলেই শহীদদের আত্মার শান্তি পাবে বলে আমরা মনে করি।”
সাকিবের মা ও শহীদ কর্নেল কুদরত এলাহীর স্ত্রী লবি রহমান অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, তদন্ত কমিশনে যাদের নাম এসেছে সরকারের পক্ষ দ্রুত তাদের নাম আগে প্রকাশ হোক এবং সকলের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
পিলখানায় হত্যাযজ্ঞে বাধাদানকারী শহীদ বিডিআরের কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর নূরুল ইসলামের ছেলে আশরাফুল আলম হান্নান বলেন, ‘তদন্তে যাদের নাম এসেছে দ্রুত তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন আগের তদন্তের ভিত্তিতেই অপরাদীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। আমরা আশাবাদী।
শহীদ মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের সন্তান রাকিন আহমেদ বলেন, নির্বাচিত সরকার এসেছে, তাদের নির্বাচনী ইসতেহারে উল্লেখ ছিল বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা। সরকারের কাছে আমাদের সে প্রত্যাশা আছে যারা মূল যড়যন্ত্রকারী, হত্যার নির্দেশদাতা ও সরাসরি জড়িত তাদের বিচার নিশ্চিত করবে।
শহীদ মেজর হোসেন সোহেল শাওনেয়াজের ছোট ভাই হোসেন শামীম ইফতেখার বলেন, সে সময় আমি সবগুলো লাশ খুঁজে আমার ভাইয়ের লাশ সনাক্ত করি। আজ ১৭ বছর পার হলেও এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। আমার মায়ের খুব ইচ্ছে ছিল ছেলে হত্যার বিচার দেখে যাওয়ার, কিন্তু হলো না। গত বছর তিনি মারা গেছেন। এখন আমরা আশায় আছি বিচার হবে। বিচার যতদিন না হবে ততদিন আমরা দাবি জানিয়ে যাব।


