ওরা বড় স্বল্পায়ু। ওরা জন্ম নেয় মরে যাওয়ার জন্য। প্রাণ না থাকলেও লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে ইংরেজিতে কথাটি প্রচলিত। হ্যাঁ, বইমেলা প্রাঙ্গণে লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের ফটকে পা রাখতেই মনে হলো ওরা বড় স্বল্পায়ু। নইলে এমন হলো কেন! দেখে মনে হচ্ছে দু-এক দিন আগে এই জমিতে গরু আর লাঙল দিয়ে নিড়ানি দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি। পুরো চত্বর জুড়ে লালচে মাটির দলা। তার ওপর বসন্তের ঝরে পড়া মরা পাতা। এমন নিষ্প্রভ চত্বরটি মানুষের অভাবে খাঁখাঁ করছে। মনে হচ্ছিল কোনো বিরানভূমিতে ঢুকে পড়েছি! মাটিগুলো সমান না করায় লিটলম্যাগ চত্বরে আগতদের হাঁটতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
বিভিন্ন ম্যাগাজিনের সম্পাদকরা বলেছেন, সব সময়ই লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণটি আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কাছে অবহেলিত থাকে। এবারও তার ব্যত্যয় হলো না। সেই অবহেলা যেন দ্বিগুণ বেড়েছে। এদিকে বাংলা একাডেমি বলছে, এই সংকট দ্রুতই কেটে যাবে। যদিও মেলার দ্বাদশতম দিনেও তা হলো না। বরং উপেক্ষার ধুলোয় মলিন হলো যেন।
মেলা শুরুর দিন থেকে গতকাল দ্বাদশতম দিন গতকাল সোমবার পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, চত্বরটি নিভুনিভু করছে। অথচ ছোটকাগজ হিসেবে পরিচিতি পেলেও কাগজ কিন্তু ছোট নয়। বড় বড় সাহিত্যিক, কবি, দার্শনিকের জন্ম হয়েছে ছোটকাগজে লিখে। ব্যক্তিগত কিংবা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র চিন্তাধারাকে প্রকাশের ইচ্ছা থেকেই লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটকাগজের জন্ম। সংক্ষেপে একে অনেকেই ‘লিটল ম্যাগ’ও বলে থাকে। প্রতিটি বই প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকে লগ্নি, যুক্ত থাকে লেখকের নামের সঙ্গে বাজারে বিকোবার প্রশ্ন। এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই সৃষ্টি
হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন। বাংলা সাহিত্যের অনেক বড় লেখক উঠে এসেছেন এই লিটল ম্যাগাজিনে লেখার মধ্য দিয়ে।
শিল্প-সাহিত্যচর্চার বিকাশে লিটল ম্যাগাজিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সংগঠন বা গোষ্ঠীর মুখপত্র হিসেবেও লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ পেয়ে থাকে। দেশে ষাটের দশক থেকে একুশের চেতনাকে ধারণ করে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা প্রসার লাভকরে। বিশিষ্ট কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কোনো না কোনোভাবে একসময় ছোটকাগজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আশির দশকে বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ছোটকাগজকর্মীরা ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নতুন ধারা, নতুন মত এবং মতবাদ চর্চা ও ঘোষণার ক্ষেত্রে ছোটকাগজ-সংশ্লিষ্ট মত ও ধারণার সপক্ষে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে থাকে।
প্রতি বছরই বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরকে ঘিরে সারা দেশের লেখক-সাহিত্যিকদের আসর দেখা যায়।
বইমেলাকে ঘিরে কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিতও হয়। তার পরও আগের সেই প্রকাশের উচ্ছ্বাস যেন খুঁজে পাওয়া গেল না।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও কথা হলো ছোটকাগজ শব্দকুঠির সম্পাদক কবি ও কথাসাহিত্যিক রোকসানা রহমানের সঙ্গে। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, তরুণ লেখকদের অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্যেই ২০১৯ সালে শব্দকুঠি সম্পাদনা শুরু। আমার বিশ্বাস তৃপ্তির পলি জমে জমে তা একদিন বিস্তীর্ণ চরে রূপ নেবে। এখন শব্দকুঠি কেবল ছোট কাগজই নয়, একটি সংগঠনও। প্রতি শুক্রবার আমরা পরীবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে সাহিত্য আড্ডা করছি। যেখানে দেশের তরুণ প্রবীণের উপস্থিতিতে দারুণ সম্মিলন ঘটে।
আত্মপ্রত্যয়ী এই কবি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ সহজ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বিভিন্ন গ্রুপে নিজেদের লেখা পোস্ট করছেন। এর ফলে, ছোটকাগজ প্রকাশের আগ্রহ কমে আসছে। পত্রিকা প্রকাশ করে তা চিন্তাশীল মানুষের হাতে পৌঁছানোর যে কষ্টকর পথ, সেখান থেকে মুক্তি দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। এক্ষেত্রে নারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে অনেক সংকটও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
কথা হলো বগুড়া শহরের মালতীনগর শান্তিবাগ থেকে আসা আরশির সম্পাদক ও কবি মাহফুল আখতারের সঙ্গে। তিনি জানান, ১৯৮৭ সাল থেকে আরশি সম্পাদনা করছেন তিনি। একসময় সাংবাদিকতাও করেছেন। প্রাণের টানেই বইমেলায় এসেছেন। উঠেছেন ঢাকার টোলারবাগে এক আত্মীয়ের বাড়িতে। ম্যালা টাকাও খরচ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না। তবে সবার সঙ্গে সম্মিলন ঘটছে। ভালোবাসার আদান-প্রদান ঘটছে। আর এসবের পেছনে সবচে বেশি তাকে অনুপ্রেরণার জল ঢেলেছেন প্রয়াত স্বামী ইদ্রিস আলী।
লিটল ম্যাগাজিন লেখমালার সম্পাদক ও গবেষক মামুন মুস্তাফা বলেন, ‘প্রতি বছরই আমাদের দাবি থাকে লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের যেন আলাদা তোরণ থাকে, যাতে বোঝা যায়, এটা লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ। এবার তা করা হয়নি।’ আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘মাটি দিয়েছে ভালো করেছে; তবে যদি ল্যান্ড লেভেলার দিয়ে সমান করে দেওয়া হতো তাহলে চত্বরটি দেখতে ভালো লাগত। পাঠক-দর্শনার্থীরা সহজে চলাফেরা করতে পারতেন। এখন আমরা নিজেরাই উষ্টা খেয়ে পড়ে যাচ্ছি।’
কিশোর ম্যাগাজিন রূপকথার সম্পাদক কাজী আমির বিরস ভঙ্গিতে বললেন, লিটলম্যাগ চত্বরের এমন দুরবস্থা এর আগে এতটা ঘটেনি। এবার যা হাল হলো।
লিটলম্যাগ চতুরে এইসব দিন নামে সবচেয়ে তরুণ এক লিটলম্যাগ সম্পাদক আজমাইন ইকতিদার ইরতিজার সঙ্গে কথা হলো। তিনি ইমপেরিয়াল কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি এই তরুণ তার এইসব দিন সম্পাদনা এবং নিজের লেখালেখির প্ল্যাটফরম হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই পত্রিকাটি। শুরু করেছেন বর্ষা সংখ্যা দিয়ে। পর্যায়ক্রমে হেমন্ত, শীতসংখ্যাও প্রকাশ করেছেন।
আর এসবের পেছনে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন বাবা আইনজীবী ইকরামুল হক ও মা হাজেরা আকতার। স্টলেও ছেলের পাশে সঙ্গ দিতে দেখা গেছে বাবা-মাকে। ইকরামুল হক বলেন, ‘বাইরে আড্ডাবাজি, খারাপ সঙ্গর চেয়ে সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়াটাকে আমি ইতিবাচকভাবেই নিয়েছি। আমি চাই আমার ছেলে একাই এক শ হিসেবে গড়ে উঠক।’
ভ্রমণবিষয়ক ম্যাগাজিন ভ্রমণগদ্যের বিক্রয়কর্মী হোসেন সোহরাব বলেন, বিক্রি হবে কী করে? লোকজনের আনাগোনাই তো নেই। বরাবরই মেলায় লিটলম্যাগ চত্বরে লোকসমাগম কম হয়। এবারও নেই বললেই চলে। তার ওপর চত্বরের যে বেহাল অবস্থা। একটু দৃষ্টিনন্দন ও পরিপাটি করলে উপস্থিতিও কিছুটা বাড়ত। তখন
বিক্রিও কিছুটা হতো।
লিটলম্যাগ চত্বরের এমন হাল নিয়ে কথা হলো কথাসাহিত্যিক শাহেদ কায়েসের সঙ্গে। জানতে চাইলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার খুবই করুণ। এমনকি করোনার সময়ও যখন বইমেলা হয়েছে তখনো কিন্তু এমন বাজে অবস্থা ছিল না। এর অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে মেলা দেরিতে শুরু হয়েছে। একুশের বইমেলা ফেব্রুয়ারিতেই হয়।
নানা অস্থিতিশীলতার কারণে মেলা পিছিয়েছে। বিগত ৫৫ বছরে অনেক সংকট হয়েছে। কিন্তু কখনো মেলা পেছায়নি। আর এ বছর সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে লিটলম্যাগ চত্বর। গত বছর এবং তার আগের বছরও বইমেলার একটা নান্দনিক পরিবেশ ছিল। এখানে প্রতি বছরই আড্ডার জায়গা দেওয়া হতো। যেখানে জমজমাট আড্ডা, গান হতো। এবার চত্বরটা ভালো হওয়া দরকার ছিল।
বিশিষ্ট কবি গোলাম কিবরিয়া পিনু বলেন, ‘লিটলম্যাগ চত্বরটা ওভাবে সাজানো হয়নি। পর্যাপ্ত আলো নেই। অনেক লিটলম্যাগ স্টল এখনো খোলাই হয়নি। এটা খুব খারাপ লাগছে। এই এলাকাটা আমাদের খুবই প্রিয় ছিল। বাংলা একাডেমির মূল জায়গার বহেরা তলায় যে লিটলম্যাগ চত্বর ছিল সেখানে আলাদা প্রাণের স্পন্দন ও উৎসব ছিল। সেটা আমরা এই লিটলম্যাগ চত্বরে পাইনি, পাইও না। কেমন জানি খাপছাড়া, নিষ্প্রভ।’ প্রকাশকরা বলেছেন, রাতে স্টল বন্ধ হওয়ার পর মেলা প্রাঙ্গণে ছিন্নমূল ও বহিরাগত মানুষের অবাধ প্রবেশ ঘটছে। এতে প্রকাশকদের কোটি কোটি টাকার বই ও সম্পদের চরম নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মূল মঞ্চ: বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘শহীদুল্লা কায়সার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিবলী আজাদ। আলোচনায় অংশ নেন প্রশান্ত মৃধা। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
আলোচনা-পরবর্তী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি ড. নাঈমা খানম এবং সেলিনা আক্তার। আবৃত্তি করেন প্রদীপ মিত্র, সৈয়দ রনো, মাহিনুর মুমু, মো. এনামুল হক এবং ইকবাল আলী।
সংগীত পরিবেশন করেন আশরাফ মাহমুদ, সনৎকুমার বিশ্বাস, জাবীর ইমাম খান, এ টি এম আশরাফ হোসেন, জামাল দেওয়ান, আশরাফুজ্জামান, মফিজুর রহমান, মো. ওবায়দুর রহমান, সুমন চন্দ্র দাস এবং আহমেদ শাকিল হাসমী।
নতুন বই: বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গতকাল সোমবার একুশে বইমেলার ১২তম দিনে মেলায় নতুন বই এসেছে ১৬৩টি। আর গত ১২ দিনে মেলায় মোট নতুন বই এসেছে ৯৯৬টি। লিটলম্যাগ চত্বরে দেখা গেছে শালুক, চিহ্ন, লিরিক, চর্যাপদ, অনিন্দ্য, মাসিক ডাকটিকিট, কবিতার কম্পাস, কালোকাগজ, জংশন, নব ভাবনা প্রভৃতি।



