‘আমি তুখোড় বইপ্রেমী সেই ছোটবেলা থেকেই। বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক বইগুলো পড়িই। রাজনৈতিক দর্শনের বইও পড়ি। বিশেষকরে ইউরোপীয় দর্শন, সক্রেটিস থেকে শুরু করে আধুনিক দর্শনের বইগুলো পড়তে ভালো লাগে। এ ছাড়া ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ার কারণে গ্রীক, রোমান সাহিত্য এবং মিথলজি, শেকসপীয়র, ডব্লিউ বি ইয়েটস, জন ডান, ওয়ার্ডস ওয়ার্থও বেশ ভালো লাগে। এ ছাড়া অ্যাংলো-স্যাক্সন থেকে শুরু করে আধুনিক, সাবকন্টিনেন্ট থেকে বাংলাদেশ সবই পড়ার চেষ্টা করি। বই আত্মার তৃপ্তি মেটায়। এখন সময়াভাবে আগের মতো বেশি বেশি বইয়ে ডুব দিতে পারি না। তবে পড়ি, প্রতিবছর বইমেলায় পরে থাকতাম। এবার খুবই নিষ্প্রাণ মনে হচ্ছে। রমজান না হলে হয়তো জমত। অফিস রমজান আর নামাজের কারণে বেশি আসা হচ্ছে না।’
বইমেলা প্রাঙ্গনে বই নিয়ে এভাবেই আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করলেন অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপ্যাল অফিসার জাকারিয়া মন্ডল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন একই ব্যাংকেরই এজিএম বইপ্রেমী মাহবুবুল ইসলাম এবং প্রিন্সিপ্যাল অফিসার জহিরুল ইসলাম। মাহবুবুল ইসলাম বলেন, বইমেলা বেশ টানে। তবে ভীড়ভাট্টা ভালো লাগে না। তারপরও কেনো জানি বইমেলা ভীষণ টানে।
একই কথার প্রতিধ্বনি তুললেন জহিরুল ইসলামও। তিনি বললেন, বইমেলায় আসা হয় প্রাণের টানে। কিন্তু অফিসের সময় আর বইমেলার সময়ের সাথে ছন্দটা মিলছে না বলে মেলার সঙ্গে এবার সংযোগটা ঘটছে না।
গতকাল মঙ্গলবার বইমেলার ১৩তম দিনেও স্বাধীনতার স্মৃতি বিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের দৃশ্যপটের বদল ঘটল না। অনেকটাই ফাঁকা এবং অনেককে অলস সময় কাটাতে দেখা গেলো।
মেলায় অনেকটা বিষন্ন মনে ঘুরছিলেন কবি নূরুল হক। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লেখালেখি করি বলেই বইমেলা চুম্বকের মতো টানে। এবারও অনেক বই কিনেছি। নতুন বইয়ের ঘ্রাণে প্রাণে অন্যরকম আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের সাথে সম্মিলন ঘটে। যা বইমেলা ছাড়া কখনওই সম্ভব নয়। তবে এবারের বইমেলাকে মেলার মতো মনে হচ্ছে না। প্রায় তো শেষই হয়ে এলো। তারপরও মেলাটা জমল না। আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম এবার মেলা হবে না। এতো বার মেলার তারিখ বদল হলে মেলায় আসার মানসিকতাই নষ্ট হয়ে যায়।’
কথা হলো জ্যেষ্ঠ প্রকাশক আহমদ পাবলিশিং হাউজের স্বত্বাধিকারী মেছবাহউদ্দীন আহমদ বললেন, ‘আমরা মূলত সারা বছরই বই প্রকাশ করে থাকি। কেবল গল্প, উপন্যাস নয়, নোবেলজয়ী সাহিত্যিকদের পাশাপাশি বিশ^সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের বইসহ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বই প্রকাশ করি। তবে মেলা উপলক্ষে খুব বেশি বই প্রকাশ করিনি। এবার মেলার পরিস্থিতি দেখেই মেলা কেমন হবে আমি বুঝে গিয়েছিলাম।
জ্যেষ্ঠ এই প্রকাশক আক্ষেপ করে বলেন, এবারের মতো এতো বিশৃংখল মেলা এর আগে বাংলা একাডেমি আর কখনওই করেনি। এ বছর বইয়ের ব্যবসায়ী নয়, এরকম যাকে তাকে বইমেলায় স্টল দিয়ে বসেছে। সবকিছুতেই তাদের কেমন যেন গা ছাড়া ভাব। সৃজনশীল প্রকাশকদের জন্য এটা দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। সরকারের এদিকে রাখতে হবে।’
বাবুই প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ও লেখক কাদের বাবু বলেন, আমাদেরকে জোর করে মেলায় আনা হয়েছে। আমরা আগে থেকেই জেনে গিয়েছিলাম এই মেলা জমবে না। কারণ পাঠকই তো বইমেলার প্রাণ। এখানে তো কোনো পাঠকই নেই। সবাই ঈদের কেনাকাটা করছে। প্রকাশকরদের ঈদ হবে না। অপেক্ষা করছি, সাপ্তাহিক ছুটির দিনের।
একই কথার প্রতিধ্বনি তুললেন জোনাকী প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী সোহানও। তিনি জানান, মেলায় লোকজন কম এলেও যারা এসেছেন তারা প্রায় সবাই বই কিনছেন। এই বিক্রয়কর্মী বলেন, ১৩ মার্চ শুক্রবার থেকে মেলা জমে উঠবে, আর ১৫ মার্চ সমাপনী দিন পর্যন্ত শেষ তিনদিন মেলায় আশানুরূপ দর্শনার্থীর আগমন ঘটবে ও আশাতীত বিক্রি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।
মূল মঞ্চ
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় “স্মরণ : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম” শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। আলোচনায় অংশ নেন হরিশংকর জলদাস। সভাপতিত্ব করেন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। আলোচনা পরবর্তী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি মজিদ মাহমুদ, মঈনুল হাসান, স্নিগ্ধা বাউল এবং ড. নাঈমা খানম। আবৃত্তি করেন সুষ্মিতা জাফর, তাসনোভা তুশিন।
সংগীত পরিবেশন করেন বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, দেলোয়ার হোসেন বয়াতি, শার্লি মার্থা রোজারিও, আশীষ শীল, মানসিফ তাজরিয়ান, নোশিন তাবাসসুম এবং মো. আসাদুজ্জামান। আরো ছিলো জিয়া সাংস্কৃতিক জোটের শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন গবেষক ইসরাইল খান এবং কবি মুহাম্মদ আবদুল বাতেন।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গতকাল মঙ্গলবার অমর একুশে বইমেলার ১৩তম দিনে নতুন বই এসেছে ১৪৬টি। আর গত ১৩ দিনে মেলায় মোট নতুন বই এসেছে ১হাজার ১৪২ টি। এর মধ্যে জনপ্রিয় প্রকাশনী এনেছে তৌহিদ আজিজের ‘যুদ্ধ না শান্তি : কোন পথে বিশ্ব’, বৈভব প্রকাশন এনেছে শাহেদ কায়েসের ‘জল হাওর একতারা’, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন এনেছে মুমিত আল রশিদের ‘ইরানি প্রেমের গল্প’, আহমদ পাবলিশিং হাউজ এনেছে অধ্যাপক শাহানা পারভীন লাভলীর ‘সাহিত্যে নোবেলজয়ী নারী’,
কথক প্রকাশন এনেছে সেলিম আহমেদের ‘১৯৪৭ : কাঁটাতারে বিভক্ত সিলেট’, পুণ্ড্র প্রকাশন এনেছে শফিক হাসানের ‘আমজনতার কাঁঠাল খাওয়া’, বাংলা একাডেমি এনেছে রাফাত আলমের ‘বাংলাদেশের উপন্যাস সাতচল্লিশের রাজনীতি’, অনন্যা এনেছে আরিফ মজুমদারের ‘হাউ টু উইন : জয়ী হওয়ার ৩৬ চৈনিক গল্পকৌশল’ ও হাসান হাফিজের ‘একলা নিঝুম ধিকিধিকি’, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. এনেছে তানভীর মোকাম্মেলের ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ উল্লেখযোগ্য।



