শিক্ষার আধুনিকায়নে বিশ্বের রোল মডেলখ্যাত দেশ সুইডেন ২০০০ সালে শিশুদের হাতে হাতে ট্যাব-ল্যাপটপ তুলে দিয়ে ডিজিটাল বিপ্লব শুরু করেছিল। বাংলাদেশও অনুসরণ করে চলছিল সেই মডেল। তবে দুই দশকের সেই বিপ্লবে জল ঢেলে দিয়ে গবেষকরা বললেন, তাছাড়া শিশুরা ইন্টারফেস ব্যবহারে দক্ষ হলেও জটিল পাঠ্য বুঝতে প্রয়োজনীয় ডিপ রিডিং দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ছে।’
গবেষণার সেই ফলাফল সচিত্তে গ্রহণ করে সুইডেন ২০২৩ সাল থেকে ডিজিটালাইজেশন ছেড়ে পুরোনো ধারার পড়ালেখায় ফিরতে শুরু করে। বইয়ের পাতার চিরচেনা ঘ্রাণ আর খসখস শব্দে ভরে উঠতে শুরু করে দেশটির ক্লাসরুমগুলো। সুইডেনের অনুসরণে অনেক দেশই এখন প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়ে শিশুদের হাতে মুদ্রিত বই তুলে দিতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে হাতের লেখার অনুশীলনও।
মুদ্রিত বইয়ে ফেরা সুইডেনের শিশুদের সঙ্গে অদ্ভুত মিল পাওয়া গেল গতকাল বৃহস্পতিবার অমর একুশে বইমেলায় আসা এক বিস্ময়কর শিশুর। মায়ের সঙ্গে ঢাকার বসুন্ধরা রিভারভিউ হাসনাবাদ থেকে আসা ব্রাইড স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণীর বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আকলাখ কবিরের সোজা কথা, ‘ঈদের নতুন পোশাকের আমার দরকার নেই। এর বদলে আমাকে বই কিনে দাও। শুধু বই কিনতে চাই। অনেক বই চাই…। অনেকটা আবদারের সুরে আকলাখ তার মাকে বলল, ‘আমাকে আরো একদিন মেলায় নিয়ে আসতে হবে।’ তার মা আঁখি আকতার বললেন, অন্য শিশুদের মতো ওর মোবাইল কিংবা গেমে কোনো আগ্রহ নেই। সারাক্ষণ বইয়ে ডুবে থাকে। আমরাও তাকে উৎসাহিত করি।’
এ প্রসঙ্গে কথাসাহিতিক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল বললেন, প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে ঘরে ঘরে গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে হবে। যাতে তরুণরা মোবাইল স্ক্রীন থেকে দূরে থাকে। বই না পড়লে সৃজনশীল হয় না। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বইমুখি করতে হলে প্রকাশনার নানা সংকট কাটিয়ে পাঠক তৈরী করতে হবে প্রকাশকদেরও। এক্ষেত্রে তাদের দায় আছে। এই লেখক আরো বলেন, শিক্ষায় ডিজিটালাইজেশন কোভিড-১৯ মহামারিকালীন বেশি জরুরি ছিল। তবে এটা শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশে অন্তরায়, তাহলে পুরোনো ধারায় ফেরাই ভালো হবে। আর সেক্ষেত্রে বইমেলার আয়োজন হতে হবে ঘন ঘন। গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় বড় গ্রন্থাগার রাখতে হবে। শিশুদের পুরোনো পথেই ফেরাতে হবে।
জানতে চাইলে অনুপম প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারি জ্যেষ্ঠ প্রকাশক মিলন নাথ বললেন, সুইডেনের শিক্ষা কাঠামো শুধু বাংলাদেশের না, গোটা বিশ্বের মডেল। তাই বাংলাদেশে নির্দ্বিধায় সেটা অনুসরণ করা দরকার। বিশেষ করে দেশের গ্রন্থাগারগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে, যে শিশুরা সেগুলোতে গিয়ে বসতে পারে, পছন্দের জ্ঞান অনুসন্ধান করতে পারে। তবে মেধাবী সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বলেন, আমার প্রকাশনার শুরু থেকেই আমাদের ছেলেমেয়েরা ভালো কিছু জানুক, সৃজনশীল মননশীল প্রজন্ম হিসেবে গড়ে উঠুক। সবচে বড়ো কথা হচ্ছে বিজ্ঞানকে জানুক।
ডিজিটাল প্ল্যাটফরমকে রাতারাতি পরিবর্তন করতে পারা যাবে না। বইয়ের ঘ্রাণ শুঁকে, বই বুকে নিয়ে জড়িয়ে ধরে পড়ার যে ফিলিং সেটা কি স্ক্রীনে পাওয়া যাবে? আগে পরিবার পরিজন নিয়ে ক্রেতারা আসতো এখন সবই পরিবর্তন হয়ে গেছে। প্রযুক্তি ধারণ করতে হবে। তবে অবশ্যই মুদ্রিত বইয়েই ফিরতে হবে। নইলে সৃজনশীল প্রজন্ম তৈরী হবে না।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষা বিষয়ক গবেষক ও ‘শৈশব’ নামক প্যারেন্টিং প্ল্যাটফরমের প্রতিষ্ঠাতা ফারহানা মান্নান বলেন, করোনাকালিন সময়ে অনলাইনে ক্লাস হতো, সেটা প্রয়োজনও ছিল। তবে আমরা এখনও পুরোপুরি অনলাইন ক্লাসরুম তৈরীই করতে পারিনি। এটাকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে যে জায়গায় যতোটুকু ব্যবহার করতে হয় এবং এটার ইতিবাচক ব্যবহার সম্পর্কে শিশুদেরকে জানানোরও প্রয়োজন আছে।
এ ছাড়া সুইডেনের এ বিষয়টিও দেখতে হবে ওরা ওদের সামাজিক কোন সমস্যাটাকে গুরুত্ব দিয়ে ডিজিটাল ক্লাসরুম কতোখানি ছেড়েছে। তাদের ডিজিটাল ক্লাসরুমের চেহারা, রূপ বা চরিত্র আগে কেমন ছিল। এটা বিশ্লেষণের বিষয়। এক বাক্যে বা অল্প কিছু তথ্যে বোঝা যাচ্ছে না, সুইডেন এমন পদক্ষেপ কেন নিয়েছে। তারা উন্নত দেশ। আমাদের জন্য নতুন কিছু গ্রহণ করা লম্বা প্রসেস। ত্যাগ করাও লম্বা প্রসেস। আমি মনে করি, ক্লাসের যে মুখোমুখি পদ্ধতি তা চলতে থাকুক। তবে বই মুদ্রিত হোক আর ডিজিটালই হোক না কেন, বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
তবে মেলায় আসা শিক্ষক ও গবেষক সৈয়দা বদরুন নেসার অভিমত, সুইডেন যে পুরোনো পথে ফিরছে, সেটা আমাদেরও জরুরি দরকার। ডিজিটাল ক্লাসরুম শিশুদের চমকালেও সৃজনশীলতা তেমন বাড়ে না। বরং মুদ্রিত বই পড়লে তাদের মনের ওপর রেখাপাত বেশি হয়। তাছাড়া বেশি বেশি অনলাইনের অভ্যাস তাদের ক্ষতিকর গেমের প্রতি আসক্তি বাড়ায়। শ্রেণিকক্ষে বই পড়া, লেখা ও চিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে, আর প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে সহায়ক মাধ্যম হিসেবে। এতে শিশুদের মনন, মনোযোগ ও সৃজনশীলতা সবই আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, করোনা মহামারির সময় বাংলাদেশেও শিশুদের পড়াশোনা চালু রাখতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্লাস নেওয়া হয়েছিল। যা সেই সময়ের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় শিশুদের হাতে আবার মুদ্রিত বই তুলে দেওয়া এবং হাতের লেখার চর্চা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
মূল মঞ্চ
বিকেলে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় “স্মরণ : মুস্তাফা জামান আব্বাসী” শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে শারমিনী আব্বাসীর লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা মোকারম হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন আশরাফুজ্জামান বাবু। সভাপতিত্ব করেন ওয়াকিল আহমদ।
প্রাবন্ধিক বলেন, প্রখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী, সংগীত পরিচালক ও সুরকার আব্বাসীউদ্দীন আহমদের পুত্র মুস্তাফা জামান আব্বাসী ছিলেন বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনের একজন মহীরুহ। শুদ্ধ, সুন্দর, সুপুরুষ জ্যোতি-বিভাসিত অন্তর ছিল তাঁর। আশরাফুজ্জামান বাবু বলেন, ভাওয়াইয়া গানের রাজপুত্র বরেণ্য সংগীতশিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী ছিলেন একজন বটবৃক্ষ।
ওয়াকিল আহমদ বলেন, শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী ছিলেন প্রথিতযশা সংগীত পরিবারের সন্তান। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন অগ্নিতা শিকদার মুগ্ধ। এছাড়াও দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাঁশরী’, ‘অচিন পাখি’, ‘বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ এবং ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমি। লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন আতাহার খান, ফজলুল হক তুহিন এবং জামশেদ ওয়াজেদ।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গতকাল ১৫তম দিনে মেলায় নতুন বই এসেছে ৮২টি। আর গত ১৫ দিনে মেলায় মোট নতুন বই এসেছে ১ হাজার ৩৩৭ টি। এর মধ্যে সাহিত্য কুটির এনেছে আবুল কাসেম ফজলুল হকের ‘সংস্কৃতি ও সভ্যতার ভবিষ্যত’, কথাপ্রকাশ এনেছে রিদওয়ান আক্রামের ‘পুনশ্চ ঢাকা’, মাওলা ব্রাদার্স এনেছে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর ‘বিস্ময় তাই জাগে’, বেঙ্গল বুকস এনেছে সেলিনা হোসেনের ‘ভ্রমণ সমগ্র’, অনন্যা এনেছে মতিন রায়হানের ‘কাটে দিন বসন্ত তালাশে’, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. এনেছে শেলী সেনগুপ্তার ‘মিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর’, মাত্রাপ্রকাশ এনেছে এম. মনিরুজ্জামানের ‘পৌষের প্রণয়’ উল্লেখযোগ্য।



