বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিদ্যমান ৪৭০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি থেকে সরে আসার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পরিবর্তে নতুন করে ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে।
গত ২১ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল এবং আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকে এই বড় নীতিগত পরিবর্তনটি নিশ্চিত করা হয়।
এর পর ২৭ মে এক বিবৃতিতে আইএমএফ-এর বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভ ক্রজনার এক বিবৃতিতে জানান, বাংলাদেশ সরকার আইএমএফ-এর কাছে একটি নতুন কর্মসূচির জন্য অনুরোধ করেছে। আইএমএফ কর্মকর্তারা তাদের সংস্কার কর্মসূচি এবং নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করছেন।
দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করার প্রচেষ্টায় আইএমএফ বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার হিসেবে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য গত এপ্রিলে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর বসন্তকালীন বৈঠক থেকে ফিরে আসার পর থেকে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি শুরু করার আগ্রহের কথা জানিয়ে আলোচনা শুরু হয়। চলমান কর্মসূচি থেকে বের হয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচি শুরু করার বাস্তবতা ও যৌক্তিকতা তুলে ধরে আইএমএফকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেবে বাংলাদেশ। নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার হতে পারে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার।
নতুন ঋণ কর্মসূচিতেও বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের শর্ত থাকবে। শর্তের ব্যাপারে আলোচনা করতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই বা আগস্টে ঢাকায় আইএমএফের একটি মিশন আসার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, জরুরি ভিত্তিতে লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ চেয়ে ২০২২ সালের ২৪ জুলাই আইএমএফে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ। ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান ঋণ চাওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ পর্ষদ এ প্রস্তাব অনুমোদন করে। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়।
আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত ৫ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি ছিল ১৮৬ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের গত অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভায় ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার আলোচনা বাংলাদেশ তুললেও আইএমএফ তাতে সম্মত হয়নি। আইএমএফের বরাতে তখনকার অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে আইএমএফ।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠিত হয়। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ও অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নেন। এপ্রিলের ওই বৈঠকেও কিস্তি ছাড়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চলমান ঋণ কর্মসূচির আগে বাংলাদেশে আইএমএফ-এর কাছে ঋণ চেয়েছিল ১০ বার। প্রথমবার ঋণ নিয়েছিল ১৯৭৪ সালে। আইএমএফ এর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঋণের জন্য সংস্থাটির কাছে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি গিয়েছে ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯০ সালে। এই ১০ বছরে বাংলাদেশ আইএমএফ এর কাছ থেকে পাঁচ বার অর্থ ধার করেছে। ঋণের ক্ষেত্রে ১৯৯০ সালে আইএমএফ এর বেশ কয়েকটি শর্ত ছিল। সেসব শর্তের আলোকে বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালু করা হয়। এছাড়া বাণিজ্য উদারীকরণ, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের শর্তও এসেছিল।
১৯৯১ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আইএমএফ এর কাছ থেকে কোন ঋণ নেয়নি। এরপর বাংলাদেশ আবার আইএমএফ-এর কাছে থেকে ঋণ নেয় ২০০৩ সালে। সেবার বড় শর্ত ছিল, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান কমিয়ে আনতে হবে।
সর্বশেষ ঋণ নিয়েছিল ২০১২ সালে যার পরিমাণ ছিল প্রায় এক বিলিয়ন ডলার। ওই সময় ট্যক্স পলিসির ক্ষেত্রে কিছু সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। সে সময় নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া মুদ্রার বিনিময় হার এবং সুদের হার নির্দিষ্ট করে তা কৃত্রিমভাবে ধরে না রেখে বাজারের উপর ছেড়ে দেবার পরামর্শ দিয়েছিল আইএমএফ।
এবারের আইএমএফর কর্মসূচিতে ব্যাপক ভিত্তিক সংস্কারের শর্ত ছিল। গতিশীল রাজস্ব ব্যবস্থা তৈরির জন্য আইএমএফ একাধিক শর্ত দেয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি আলাদা বিভাগ করা।
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য আইএমএফের আরেকটি শর্ত হলো সব ধরনের করছাড় বাতিল করতে হবে। তিন ধাপে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে করছাড় প্রত্যাহার করতে হবে। আইএমএফের অন্যতম বড় শর্ত হলো প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে।
সেই শর্ত কোনো বছরই পূর্ণ হয়নি। ব্যাংকিং খাতেও বড় শর্ত দেওয়া হয়। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন, পরিচালকদের সংজ্ঞাসহ ব্যাংক কোম্পানি সংশোধন করার শর্ত দিয়েছে আইএমএফ। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের সার্বিক খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের নিচে নামানোর শর্ত থাকলেও তা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসন ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করার শর্ত ছিল, সেটিও পিছিয়ে গেছে।



