বাংলাদেশে আরো বেশি মার্কিন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে দৃঢ় অর্থনৈতিক সংস্কার, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে প্রচলিত সহায়তানির্ভর কাঠামোর বাইরে নিয়ে গিয়ে পারস্পরিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে হবে।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘ফ্রিডম ২৫০’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) এবং ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম (জোনায়েদ সাকি), অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ক‚টনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা, উন্নয়ন সহযোগী এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যে ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অর্থ ‘আমেরিকা একা’ নয়; বরং অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে উভয় দেশের জন্য প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং যৌথ সমৃদ্ধির ভিত্তিতে প্রকৃত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায়।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) বাস্তবায়িত হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স¤প্রসারণ, উদ্ভাবন, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সহযোগিতার নতুন ভিত্তি তৈরি হবে।
বাংলাদেশকে এ অঞ্চলের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, দেশের তরুণ কর্মশক্তি, শক্তিশালী বেসরকারি খাত এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অর্থনৈতিক সংস্কার আরো জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, দুর্নীতি মোকাবিলা, বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো বাড়বে। এসব সংস্কার দেশীয় ও বিদেশি—উভয় ধরনের বিনিয়োগের জন্যই অনুক‚ল পরিবেশ তৈরি করবে।
ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন আরো বলেন, জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত উৎপাদনশিল্প, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। স¤প্রতি জ্বালানি খাতে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন গতি এনেছে এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেন, সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তিনি মার্কিন উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে আরো বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) করার আহŸান জানান।
তিনি বলেন, বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ কর্মশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপার্ক ও হাইটেক পার্কে বিভিন্ন প্রণোদনা দিচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করছে।
মাহদী আমিন বলেন, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো বড় ভ‚মিকা রাখতে পারে। তিনি জ্বালানি, উড়োজাহাজ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), বস্ত্র, ওষুধ, কৃষিভিত্তিক রপ্তানি এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহবান জানান।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অ্যামচেম বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স¤প্রসারণে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সেবা এবং উড়োজাহাজ চলাচলসহ বিভিন্ন খাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মান, উন্নত প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সর্বোত্তম চর্চা নিয়ে এসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ভবিষ্যতেও আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতে অ্যামচেম সরকারের সঙ্গে কাজ করবে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি কেবল একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক নয়; এটি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। পারস্পরিক আস্থা, নীতিগত সংস্কার এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আগামী দিনে আরো স¤প্রসারিত হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, ক‚টনীতিক, শীর্ষ ব্যবসায়ী, উন্নয়ন সহযোগী এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।



