রুনা লায়লার কণ্ঠে স্মৃতিমাখা এক অবিস্মরণীয় সুরসন্ধ্যা
বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে যার কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছেন দেশের কোটি কোটি মানুষ। বিশ্বের নানা প্রান্তের অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ মাতানোর পরও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে কখনো একক কনসার্ট করা হয়নি তার। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। ৬২ বছরের পেশাদার সংগীতজীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী থাকল শিল্পকলা একাডেমি।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) শ্রাবণের এক আবেগঘন সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ পরিণত হয় সংগীতপ্রেমীদের মিলনমেলায়। অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগেই জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনের প্রতিটি আসন পূর্ণ হয়ে যায়। নানা বয়সী দর্শকের একটাই প্রত্যাশা—সামনাসামনি শুনবেন প্রিয় শিল্পী রুনা লায়লার কণ্ঠ।
সন্ধ্যা ৭টায় সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের সঙ্গে রুনা লায়লা মঞ্চে উঠতেই দাঁড়িয়ে করতালিতে তাকে অভিবাদন জানান উপস্থিত দর্শকরা। মুহূর্তেই পুরো মিলনায়তনে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন একাডেমির সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অভিনেতা ও নির্মাতা আফজাল হোসেন উপস্থাপনা করেন। শুরুতেই সংস্কৃতিমন্ত্রী রুনা লায়লার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
এরপর শুরু হয় প্রতীক্ষিত একক সংগীতানুষ্ঠান। ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা ৭টা ৩৩ মিনিটে মাইক্রোফোন হাতে নেন রুনা লায়লা। সোনালি নকশায় সজ্জিত লাল শাড়িতে মঞ্চে উপস্থিত হয়ে প্রথমেই মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পরিবেশন করেন দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যারা দিয়ে গেছে প্রাণ, ভুলিনি আমরা’। প্রথম গানেই আবেগে ভেসে যায় পুরো মিলনায়তন।
এরপর একে একে তিনি গেয়ে শোনান তার দীর্ঘ সংগীতজীবনের জনপ্রিয় ও কালজয়ী গানগুলো। পরিবেশিত গানের মধ্যে ছিল ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাবো’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে বলো কী হবে’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাওনা মাগো’, ‘ও বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িতে গেলাম’, ‘ভুলিতে পারিনে তারে’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’, ‘স্বাদের লাউ বানাইলা মোরে বৈরাগী’ এবং দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে গাওয়া বিখ্যাত সুফি গান ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’।
প্রায় দেড় ঘণ্টার এই পরিবেশনায় তিনি মোট ১১টি কালজয়ী গান পরিবেশন করেন। প্রতিটি গান শেষে দীর্ঘ করতালি আর দর্শকদের সম্মিলিত কণ্ঠ যেন প্রমাণ করে দেয়—সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু রুনা লায়লার জনপ্রিয়তায় এতটুকুও ভাটা পড়েনি। অনেক দর্শক শিল্পীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়েছেন তার অমর গানগুলো। পুরো মিলনায়তন যেন এক বিশাল সুরের আসরে পরিণত হয়।
অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রুনা লায়লা বলেন, “আমাদের সংগীতের দীর্ঘ পথচলা, গান আর স্মৃতিগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এ ধরনের আয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৬২ বছরের পেশাদার সংগীতজীবনে শিল্পকলা একাডেমিতে দুই-তিনবার গান গেয়েছি। তবে একক কনসার্ট এবারই প্রথম। এই ভালোবাসা আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করেছে।”
এই আয়োজন কেবল একটি কনসার্ট ছিল না; ছিল বাংলা গানের এক উজ্জ্বল ইতিহাসকে উদযাপনের উপলক্ষ। আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় সুর, লোকগান এবং দেশাত্মবোধক সংগীত—সব মিলিয়ে এক সন্ধ্যায় রুনা লায়লা যেন তার ছয় দশকের সংগীতযাত্রার নির্বাচিত মুহূর্তগুলো দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের আরেকটি মানবিক দিকও ছিল প্রশংসিত। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কনসার্টের টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় ব্যয় করা হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জানিয়েছে, সংগৃহীত অর্থ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে জমা দেওয়া হবে।
সবশেষে বলা যায়, এই সন্ধ্যা শুধু একটি কনসার্ট নয়, বরং বাংলা সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি রুনা লায়লার প্রতি দর্শকদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার এক অনন্য প্রকাশ। শিল্পকলার মঞ্চে তার প্রথম একক পরিবেশনা তাই দীর্ঘদিন ধরে সংগীতপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।



