চার মোবাইল কোম্পানির কাছে আটকা ১৩ হাজার কোটি টাকা

দেশের চারটি মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে সরকারের মোট ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে এ অর্থ আদায় সম্ভব না হওয়ায় সমাধানের পথ খুঁজতে টেলিযোগাযোগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনা চাইতে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

একই সঙ্গে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে ব্যবহৃত সিম শনাক্ত হওয়ায় গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটককে মোট ৮ কোটি ৬৮ লাখ ২০ হাজার টাকা প্রশাসনিক জরিমানা করেছে সংস্থাটি।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, চারটি মোবাইল অপারেটরের কাছে সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব পাওনা দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। নানা জটিলতার কারণে অর্থ উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না।

এ অবস্থায় টেলিযোগাযোগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে তিনটি বিকল্প তুলে ধরা হবে—আইনি প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা, অপারেটরদের প্রস্তাব অনুযায়ী সালিসি (আরবিট্রেশন) প্রক্রিয়ায় যাওয়া অথবা সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ছাড় দিয়ে হলেও পাওনা আদায় করা। তাঁর ভাষায়, “মূল লক্ষ্য জনগণের টাকা উদ্ধার করা।”

এর আগে গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, চার অপারেটরের মধ্যে গ্রামীণফোনের কাছে সরকারের পাওনা ৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা, টেলিটকের কাছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, রবির কাছে ৬১৫ কোটি টাকা এবং বাংলালিংকের কাছে ৪৭৩ কোটি টাকা।

মন্ত্রী জানান, টেলিটকের বকেয়ার মধ্যে লাইসেন্স ফি, রেভিনিউ শেয়ারিং, স্পেকট্রাম ফি, প্রশাসনিক জরিমানা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের অর্থ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এর মধ্যে ৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা ইকুইটি কনভার্সনের আবেদন করেছে, যা বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন।

গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে ইনফরমেশন সিস্টেম অডিটের ভিত্তিতে বিটিআরসির দাবি ছিল ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। আদালতের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটি ২ হাজার ৩৯২ কোটি ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও এখনো প্রায় ৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।

একইভাবে রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে অডিট আপত্তির ভিত্তিতে ৬৭৮ কোটি টাকা দাবি করা হয়। আদালতের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটি ১৩৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। বর্তমানে তাদের প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এছাড়া রাজস্ব ভাগাভাগি সংক্রান্ত আরও ১২৫ কোটি টাকার ভ্যাট দাবি রয়েছে।

বাংলালিংকের ক্ষেত্রে বিটিআরসির দাবি ছিল ৮১১ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন খাতে মোট ৩৮১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। বর্তমানে তাদের প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।

এদিকে অবৈধ আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন (ভিওআইপি) কার্যক্রমে ব্যবহৃত ৮ হাজার ৬৮২টি সিম শনাক্ত করায় চার অপারেটরকে মোট ৮ কোটি ৬৮ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে বিটিআরসি। আগামী ১০ দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে সংশ্লিষ্ট অপারেটরগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

জরিমানার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা গুনতে হবে রবি আজিয়াটাকে। তাদের ৫ হাজার ৯৩৫টি সিম অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলালিংকের ১ হাজার ৮৮২টি সিমের জন্য জরিমানা করা হয়েছে ১ কোটি ৮৮ লাখ ২০ হাজার টাকা। টেলিটকের ৬৮১টি সিমের জন্য জরিমানা ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং গ্রামীণফোনের ১৮৪টি সিমের জন্য জরিমানা করা হয়েছে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

বিটিআরসির নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, মোবাইল অপারেটর লাইসেন্সের শর্ত এবং কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অপারেটরগুলো ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে ব্যবহৃত প্রতিটি সিমের বিপরীতে ১০ হাজার টাকা হারে প্রশাসনিক জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী বলেন, অবৈধ ভিওআইপি প্রতিরোধে অভিযান চলমান থাকবে। পাশাপাশি গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে আগামী মাস থেকে সেবার মান পর্যবেক্ষণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে। কোনো অপারেটর নির্ধারিত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments