চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের বহুল আলোচিত নাম মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। চাঁদাবাজি, হত্যা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে তিনি নগরীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে অন্যতম প্রভাবশালী সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতি পান। দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে থাকার পর অবশেষে যশোরের ঝিকরগাছা এলাকা থেকে পালানোর সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের বাসিন্দা ডেভিড ইমন প্রথমে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে তিনি নিজস্ব একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি অপরাধ জগতের একটি প্রভাবশালী নাম হয়ে ওঠেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আবাসন ব্যবসা, ঠিকাদারি, গার্মেন্টস, পরিবহন, খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসা, ইন্টারনেট ও কেবল টিভি ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করত ডেভিড ইমনের বাহিনী।
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিদেশি নম্বর থেকে প্রাণনাশের হুমকি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, গুলি ছোড়া, ভাঙচুর এবং পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি ব্যবসায়ী মহলে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলাসহ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মামলা রয়েছে। চট্টগ্রামের আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও তার নাম উঠে আসে। বিশেষ করে নগরীর অপরাধ জগতের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমন শুধু সরাসরি অপরাধ পরিচালনাই করতেন না; তিনি একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। তার সহযোগীরা অস্ত্র বহন, চাঁদা আদায়, নজরদারি এবং হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করত।
সাম্প্রতিক সময়ে তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ডেভিড ইমনের হয়ে কাজ করার কথাও স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের মুখে ডেভিড ইমন আত্মগোপনে চলে যান। বিভিন্ন সময়ে তিনি অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে দেশত্যাগের চেষ্টা করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে যশোরের ঝিকরগাছা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের মতে, ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস, অস্ত্রের জোগানদাতা, সহযোগীদের অবস্থান এবং চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক আলোচিত অপরাধগুলোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তার গ্রেপ্তারকে চট্টগ্রামের সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে।



