আরও ২৩ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র

ঝুঁকিপূর্ণ পথে যুক্তরাষ্ট্র যেতে জনপ্রতি ব্যয় ৫০–৬৫ লাখ টাকা, ১৩–১৫টি দেশ পাড়ি দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম

অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে আরও ২৩ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে বিশেষ ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।

বিমানবন্দরে ফেরত আসার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক)-এর সহযোগিতায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, পরামর্শ এবং নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য পরিবহনসেবা দেয়।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ফেরত আসা ২৩ বাংলাদেশির মধ্যে ১৩ জন নোয়াখালীর বাসিন্দা। এছাড়া সিলেটের তিনজন রয়েছেন। অন্যদের মধ্যে কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, ঢাকা ও অন্যান্য জেলার বাসিন্দারাও রয়েছেন।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জানান, ফেরত আসা ব্যক্তিদের প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাদের অধিকাংশই দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রুট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে জনপ্রতি গড়ে ৫০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে। উন্নত জীবন ও ভালো আয়ের আশায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেও শেষ পর্যন্ত তারা অভিবাসন-সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় পড়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। অনিয়মিত পথে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দুর্গম পথে ১৩–১৫টি দেশ পাড়ি

প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, ফেরত আসা ২৩ জনের মধ্যে ২০ জন ব্রাজিল থেকে বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও গুয়াতেমালা হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রম করে অনিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন।

এ দীর্ঘ ও দুর্গম যাত্রাপথে তাদের ১৩ থেকে ১৫টি দেশ বাসে এবং অনেক ক্ষেত্রে পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হয়েছে। বিপজ্জনক ও অপরিচিত ভূখণ্ড পাড়ি দিয়ে মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছে তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

ফেরত আসা ব্যক্তিদের মধ্যে একজন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ব্রাজিল হয়ে একই রুট ব্যবহার করেন। অপর একজন নিউইয়র্ক রুট দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।

ব্রাজিল যাওয়ার পর দালালচক্রের সহায়তা

ফেরত আসা বাংলাদেশিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল রুট ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। অন্যরা ট্যুরিস্ট ভিসায় ব্রাজিলে প্রবেশের পর দালালচক্রের সহায়তায় ধাপে ধাপে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশ পাড়ি দেন।

দালালদের দেওয়া উন্নত জীবনের আশ্বাস এবং যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ আয়ের প্রলোভনে তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনিয়মিত অভিবাসনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেও শেষ রক্ষা হয়নি

ফেরত আসা ব্যক্তিদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজও করেছেন। তবে বৈধ অভিবাসনের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারায় তারা দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নজরে পড়েন।

পরবর্তী সময়ে মার্কিন অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের আটক করা হয় এবং দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

মার্কিন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানকারী অভিবাসীদের আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যেতে পারে। আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হওয়ায় চার্টার্ড ও বিশেষ ফ্লাইটে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর ঘটনাও বেড়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনে জোরদার অভিযান

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অনিয়মিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একাধিক দফায় নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে গতকাল আরও ২৩ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

২০২৫ সাল থেকে ফেরত ৩৬৯ বাংলাদেশি

ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ৩৬৯ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি ৩৬ জন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৯ জন এবং ৩০ জুলাই ২৩ জন বাংলাদেশি দেশে ফেরত আসেন।

এর আগে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ৩১ জন, ২৮ নভেম্বর চার্টার্ড ফ্লাইটে ৩৯ জন এবং ৮ জুন চার্টার্ড ফ্লাইটে ৪২ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের ৬ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত একাধিক ফ্লাইটে অন্তত ৩৪ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের আহ্বান

বিপুল অর্থ ব্যয় করে ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে যাওয়ার পর দেশে ফেরত আসার ঘটনায় অনিয়মিত অভিবাসনের ভয়াবহতা আবারও সামনে এসেছে। দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে বিপজ্জনক পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা না করে বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

সংস্থাটির মতে, অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি আটক, প্রতারণা, মানবপাচার, নির্যাতন, আইনি জটিলতা এবং শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিও থাকে। তাই বিদেশ যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করে বৈধ প্রক্রিয়ায় অভিবাসনের পথ বেছে নেওয়াই নিরাপদ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments