যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ পালিত হয়েছে। বুধবার বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী।
এ উপলক্ষে সকাল ১০টায় নোবিপ্রবি প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে বিজয় শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। শোভাযাত্রা শেষে নোবিপ্রবি শহিদ মিনারে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
এরপর নোবিপ্রবি বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন অডিটোরিয়ামে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সভার শুরুতে পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ, জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র, ন্যায় বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জুলাই যোদ্ধা, ১৪০০ শহিদের পরিবার, ত্রিশ হাজার আহত ও শতশত অঙ্গহানী হওয়া বীর সন্তানদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। কেবল সমবেদনা কিংবা কৃতজ্ঞতা নিবেদনের মাধ্যমেই তাদের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়, বরং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সকলের আত্মদানের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব।
এ সময় তিনি নোবিপ্রবির উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সকল ছাত্র সংগঠনকে অতীতের মতো পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও ঐক্যের মনোভাব নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। ৫ আগস্টের পূর্বে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিলো, ঠিক একই চেতনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে সকলকে ভূমিকা রাখতে হবে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং আগামী প্রজন্মের নিকট এর ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে নোবিপ্রবিতে অচিরেই একটি জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও ইতিহাসের বিরোধীতাকারী যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে সকলকে সতর্ক করেন।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্যরা নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি বিধানের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন উপাচার্য।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক নোবিপ্রবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, আজকের আলোচনা থেকে যেটা উঠে এসেছে তা হলো আমাদের ঐক্য দরকার। গণতন্ত্রের জন্য এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে শতশত মানুষ প্রাণ দিয়েছে এবং আহত হয়েছে।
আমরা কি জবাব দিবো সেই মাকে যেই মা সন্তান হারিয়েছে, যিনি আজও দরজায় দাঁড়িয়ে সন্তানের আগমনের অপেক্ষা করছে। যখন কোথাও ঐক্য না থাকে তখনই তৃতীয় শক্তি আসার সুযোগ পায়। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ না থাকি তাহলে দেশে আবার ফ্যাসিবাদের উত্থান হবে। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকাটা অত্যন্ত জরুরী।
আমরা ন্যায্যতার ভিত্তিতে এ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে চাই। আজ জুলাই যোদ্ধা এবং গেস্ট অব অনার হিসেবে যারা উপস্থিত রয়েছেন তাদের এবং আয়োজনকে স্বার্থক করার জন্য বিভিন্ন কমিটিতে যারা কাজ করেছেন তাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নোবিপ্রবি কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. হাছান উদ্দীন বলেন, আজ আমরা একত্রিত হয়েছি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ¦ল ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করতে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান শুধুমাত্র একটি আন্দোলন ছিলো না, এটা ছিলো আমাদের ন্যায় বিচার, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের একটি ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন অল্প সময়ের মাঝেই স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।
এর ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকার পতনের মধ্যদিয়ে দেশে এক নতুন সূর্যোদয়ের সূচনা হয়েছিলো। আজ অভ্যুত্থানে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং যারা আহত হয়েছেন তাদের সুস্থতা কামনা করছি। বর্তমানে আমরা চাই ঐক্যবদ্ধ একটি বাংলাদেশ। ছাত্র-জনতা যে ধৈর্য্য ৫ আগস্টের পর দেখিয়েছে ভবিষতেও আমরা সেই ধৈর্য্য ও ঐক্যবদ্ধতা দেখতে চাই।
আলোচনা সভায় গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ ও সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার।
সভায় অন্যান্যের মাঝে বক্তব্য রাখেন, নোবিপ্রবি ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ, প্রক্টর এ এফ এম আরিফুর রহমান, ফলিত গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল করিম, ডেপুটি রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন, শাখা কর্মকর্তা আবদুল কাদের ও মো. শান-ই-এলাহী বাবু, পরিবহন শাখার প্রধান সহকারী মিজানুর রহমান, এগ্রিকালচার বিভাগের শিক্ষার্থী ও নোবিপ্রবি ছাত্রদল সভাপতি জাহিদ হাসান, ফিমস্ বিভাগের শিক্ষার্থী ও নোবিপ্রবি ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান হাসিব, নোবিপ্রবি আইআইটি’র শিক্ষার্থী ও নোয়াখালী জেলা জাতীয় ছাত্রশক্তির সদস্য সচিব মেহেদী হোসেন সীমান্ত, জাতীয় ছাত্রশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক আকিলুর রহমান, নোবিপ্রবি ইসলামী ছাত্রশিবির সভাপতি আরিফুর রহমান সৈকত, নোবিপ্রবি ইসলামী ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক মেহেদী হাসান, সমন্বয়ক ও চব্বিশের আন্দোলনের নারী শিক্ষার্থী ময়ুরী খাতুন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত এগ্রিকালচার বিভাগের শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জাফর আহমেদ সজীব। এ সময় নোবিপ্রবি বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বিভাগের চেয়ারম্যান, হল প্রভোস্ট, দপ্তর ও শাখা প্রধান, ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে ছিল, ভিডিও প্রদর্শনী, পুরস্কার বিতরণ, সম্মাননা প্রদান, দোয়া ও মুনাজাত। অনুষ্ঠানে জুলাই যোদ্ধা ও আহতদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।
এছাড়াও চিত্রাঙ্কন ও নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের জুলাই বিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। এদিন বিকেলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজনে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।



