ঢামেকে চিকিৎসক-কর্মচারী হাতাহাতি, নেপথ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি

পরিচালকের কক্ষে চিকিৎসকদের অবস্থান, কর্মচারীদের প্রতিবাদ; রাতে স্বাস্থ্যসচিবের বৈঠকে সমাধান

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) মো. রেজাউল ইসলামের বদলিকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকাল থেকে হাসপাতালের প্রশাসনিক এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের কক্ষে অবস্থান নেন চিকিৎসকদের একটি অংশ। অন্যদিকে কর্মচারীর ওপর হামলার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদে অবস্থান নেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা।

পরে রাতে স্বাস্থ্যসচিব ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর বিরোধের সমাধান হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বদলি থেকেই বিরোধের সূত্রপাত

ঢামেকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলামের বদলিকে কেন্দ্র করেই এই বিরোধের সূত্রপাত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) গত ২৮ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনে রেজাউল ইসলামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করেন।

একই প্রজ্ঞাপনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হককে ঢামেকে পদায়ন করা হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রেজাউল ইসলামের স্থলে মোজাম্মেল হকের ঢামেকে দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুরোধ করা হয় বলে জানা গেছে।

কয়েক সপ্তাহ পর বদলি বাতিল

পরিস্থিতিতে নতুন মোড় আসে সোমবার (১০ আগস্ট)। ওই দিন জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনে রেজাউল ইসলামের বদলি বাতিল করে তাকে ঢামেক হাসপাতালেই বহাল রাখা হয়।

অর্থাৎ, ২৮ জুলাই তাকে ঢামেক থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে বদলি করা হলেও প্রায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে পুনরায় ঢামেকেই রাখা হয়। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের ভেতরে উত্তেজনা আরও বাড়ে।

রেজাউল ইসলামের বদলি বাতিলের আগে তাকে সরিয়ে মোজাম্মেল হককে ঢামেকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার চেষ্টা নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়।

কক্ষে তালা লাগানোর অভিযোগ

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোজাম্মেল হকের পক্ষে কয়েকজন জুনিয়র চিকিৎসক রেজাউল ইসলামের কক্ষে তালা লাগানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এ সময় দায়িত্ব পালনরত হানিফ নামে হাসপাতালের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এতে বাধা দিলে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন কর্মচারীরা।

ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা জড়ো হয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। পরে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

তবে সংঘর্ষের সময় ঠিক কারা প্রথম হামলা করেছে, সে বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

কর্মচারীদের অবস্থান ও স্মারকলিপির ঘোষণা

হামলার অভিযোগের প্রতিবাদে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা অবস্থান নেন।

ঢামেক হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. শিপন মিয়া বলেন, “কর্মচারীর গায়ে হাত তোলার ঘটনা মেনে নেওয়া হবে না।”

তিনি জানান, এ ঘটনায় তারা হাসপাতালের পরিচালকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

কর্মচারীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও কোনো কর্মচারীর ওপর শারীরিকভাবে হামলা গ্রহণযোগ্য নয়।

পরিচালকের কক্ষে চিকিৎসকদের অবস্থান

অন্যদিকে ঘটনার পর চিকিৎসকদের একটি অংশ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের পদত্যাগের দাবিতে তার কক্ষের সামনে অবস্থান নেন।

একপর্যায়ে পরিচালক তার কক্ষে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে।

চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি-পদায়ন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে হাসপাতালের প্রশাসনিক এলাকায় বাড়তি নজরদারি বাড়ানো হয়।

পরিচালকের বক্তব্য

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকারি চাকরিতে বদলি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক বিষয়। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী একজন কর্মকর্তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি করা হতে পারে।

তিনি বলেন, “তবে ব্যক্তিস্বার্থে কেউ জোরপ্রয়োগ করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।”

বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাতে স্বাস্থ্যসচিবের বৈঠক

দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পর রাতে স্বাস্থ্যসচিব ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

বৈঠকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামের বদলি, নতুন কর্মকর্তার পদায়ন, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধের সমাধান করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর ফলে দিনভর চলা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির অবসান ঘটে।

বদলি নিয়ে কেন এত উত্তেজনা?

সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ঢামেকের ঘটনায় একই কর্মকর্তাকে প্রথমে বদলি এবং পরে সেই বদলি বাতিল করে আবার একই প্রতিষ্ঠানে বহাল রাখার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই বিরোধ তীব্র হয়েছে।

একদিকে নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে চিকিৎসকদের একটি অংশ অবস্থান নেয়। অন্যদিকে বর্তমান প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বহাল রাখার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে কর্মচারীদের মধ্যে ভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়।

প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের এই টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক-কর্মচারীদের হাতাহাতি ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।

রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে উদ্বেগ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা রোগীদের চিকিৎসাসেবার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তা কোনোভাবেই চিকিৎসক, কর্মচারী কিংবা হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করার পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়।

এই ঘটনার মাধ্যমে ঢামেকের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়া এবং কর্মস্থলে পারস্পরিক শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

রাতে স্বাস্থ্যসচিবের বৈঠকের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিরোধের অবসান হলেও সংঘর্ষের ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments