সিলেটের দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজার থানার সিলাম এলাকায় একটি মাজারের ওয়াকফ এস্টেট, মসজিদ ও ৪০টি দোকানকোঠার নিয়ন্ত্রণ এবং দানবাক্সের টাকা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেনসহ অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে সাতজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) বেলা ১টার দিকে সিলাম চকবাজার এলাকায় হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) জামে মসজিদ ও ঈদগাহের সামনে এ সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে উভয় পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে বলে জানা গেছে। পরে পুলিশ, স্থানীয় নেতা ও মুরব্বিদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) ওয়াকফ এস্টেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শেখপাড়া এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। ওয়াকফ এস্টেটের আওতাধীন মসজিদ, মাজার, প্রায় ৪০টি দোকানকোঠা এবং দানবাক্সের অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ আরও জটিল হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করতে উভয় পক্ষের লোকজন মসজিদে আসেন। নামাজের পর ওয়াকফ এস্টেট ও দোকানকোঠার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরে উভয় পক্ষ ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের ওপরও হামলা
সংঘর্ষের খবর পেয়ে মোগলাবাজার থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উভয় পক্ষের হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেনসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন।
এ ছাড়া দুই পক্ষের আরও অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শেখপাড়া গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি ও মসজিদের মোতাওয়াল্লী ফজলু মিয়া, শুয়েব আহমদ, আরিফুল হক রনি, লতিফুর রহমান মেহদি, শাহ আব্দুল মান্নান, শাহ আবুল ও শাহ সুমনসহ অনেকে রয়েছেন।
আহতদের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সংঘর্ষের কারণে চণ্ডিপুল-বালাগঞ্জ সড়কে যান চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) মাজার ওয়াকফ এস্টেটের (ইসি নং-১২৭৩৫) পরিচালনা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত আরও আগে।
গত ২৯ জুলাই ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের এক আদেশে ওই ওয়াকফ এস্টেট পরিচালনার জন্য নয় সদস্যের একটি কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
কমিটিতে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিককে সভাপতি, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সহসভাপতি এবং ফজলু মিয়াকে মোতাওয়াল্লী করা হয়। এ ছাড়া আবেদ রাজা ও আহমদুর রহমান ছাদেককে যুগ্ম মোতাওয়াল্লী এবং মোয়াজ্জেম হোসেন লনি, লুতফুর রহমান বাবু, আব্দুল মতিন শাহিন ও আব্দুস সামাদকে সদস্য করা হয়।
এই কমিটি গঠন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে শাহ আব্দুল মান্নান উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন (নং ১০৭৬৭/২৬) দায়ের করেন।
হাইকোর্টের আদেশের পরও উত্তেজনা
গত ১৬ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মো. তাজরুল হোসাইনের বেঞ্চে রিটের শুনানি হয়। শুনানি শেষে ওয়াকফ প্রশাসক অনুমোদিত কমিটি বহাল রাখা হয়।
তবে সাময়িকভাবে মোতাওয়াল্লী ফজলু মিয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে আবেদ রাজাকে মাজার ও মসজিদের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। শুক্রবারের সংঘর্ষের পেছনেও আদালতের আদেশ ও ওয়াকফ এস্টেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়টি অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার মুরব্বিদের বৈঠক
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মনজুরুল আলম বলেন, শনিবার এশার নামাজের পর দুই পক্ষের মুরব্বিদের বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বর্তমানে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে।
এদিকে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে এমন সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা এবং ওয়াকফ এস্টেটের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।



