ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা, পূজা-অর্চনা ও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সারাদেশে উদযাপিত হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব জন্মাষ্টমী। শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দিনটি উপলক্ষে বিশেষ প্রার্থনা, শ্রীশ্রী গীতাযজ্ঞ, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, সন্ধ্যারতি, কীর্তন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
গতকাল সকাল ৮টায় রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে জন্মাষ্টমীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ ও মিশনের উদ্যোগে গীতাযজ্ঞ পরিচালনা করা হয়।
উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি এবং ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির যৌথভাবে এ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রাটি পলাশী বাজার, জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট, বঙ্গবাজার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবন, গোলাপশাহ মাজার, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায় সাহেব বাজার মোড় হয়ে বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হয়।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পলাশীর মোড়ে ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিলের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও নৃগোষ্ঠী বিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম, সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার প্রমুখ বক্তব্য দেন।
আলোচনা সভা শেষে অতিথিরা প্রদীপ জ্বালিয়ে ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিলের উদ্বোধন করেন।
হিন্দু পুরাণমতে, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য এদিন মথুরায় কংসের কারাগারে মা দেবকী ও বাবা বসুদেবের ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ—এমন বিশ্বাস থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দিনটি পালন করে থাকেন। তাদের বিশ্বাস, যুগে যুগে অন্যায় ও অসত্যের বিনাশ এবং সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় ভগবান মানুষের কাছে আবির্ভূত হন।
জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রায় মানুষের ঢল নামে। শোভাযাত্রায় শ্রীকৃষ্ণের রথ, রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তি, কংসের কারাগার, রাম-সীতা, লব-কুশসহ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে সাজসজ্জা ছিল। রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ট্রাক, মিনিট্রাক, পিকআপ, ঘোড়ার গাড়ি ও হাতি নিয়ে ভক্তরা ঢাকেশ্বরী মন্দির ও পলাশী মোড়সংলগ্ন এলাকায় জড়ো হন।
বিভিন্ন দৃশ্যপট নিয়ে ধর্মীয় আঙ্গিক বজায় রেখে রাজধানীর প্রতিটি মন্দির ও হিন্দু সংগঠনও শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।
এদিকে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী মহোৎসব উপলক্ষে বৃহস্পতিবার থেকে তিন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবে শুক্রবার ইসকন স্বামীবাগ আশ্রমে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, কীর্তনমেলা, বিকেলে আলোচনা সভা, সন্ধ্যায় সন্ধ্যা-আরতি, এরপর শ্রীকৃষ্ণলীলামৃত পাঠ এবং রাতে শ্রীকৃষ্ণের মহাভিষেক অনুষ্ঠিত হয়।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয়। এছাড়া রাজধানীর রমনা কালীমন্দির, রাজাবাগের বরদেশ্বরী কালিমাতা মন্দির, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দির, পূজামণ্ডপ ও ধর্মীয় সংগঠন জন্মাষ্টমী উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।



