রাজধানীর বিজয়নগরে শুক্রবার রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মারধরে গুরুতর আহত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর গুরুতর আহতাবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর থেকে অচেতন অবস্থায় ছিলেন তিনি। শনিবার সকালে জ্ঞান ফিরলে চোখ মেলে তাকান। এরপরই তার সিটি স্ক্যান করানো হয়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নুরের মাথার হাড়, নাক ও ডান পাশের চোয়ালের হাড় ভেঙে গেছে। মাথায় আঘাতের কারণে সামান্য রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং এক চোখে মারাত্মক ক্ষতি দেখা দিয়েছে। যদিও তিনি বর্তমানে স্থিতিশীল আছেন, তবে চিকিৎসকেরা ৪৮ ঘণ্টার আগে তাকে শঙ্কামুক্ত বলতে পারছেন না। চিকিৎসার জন্য উচ্চ পর্যায়ের ৬ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এদিকে নুরের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এছাড়া শুক্রবার রাতে ও শনিবার নুরকে দেখতে ও চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে গেছেন সরকারের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।
ঢামেকের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, শুক্রবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে নুরুল হককে হাসপাতালে আনা হয়। সে সময় তার নাক থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং গজ ব্যান্ডেজ দিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রথমে তাকে জরুরি বিভাগের ওয়ান-স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে (ওসেক) প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে রাত ১২টার দিকে তাকে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তখনই প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। শনিবার সকালে মাথার সিটি স্ক্যানের রিপোর্টে দেখা গেছে, তার মাথার হাড় ও চোয়ালের হাড় ভেঙেছে। নাকের হাড়ও ভেঙে গেছে। মাথার ভেতরে সামান্য রক্তক্ষরণ রয়েছে। চোখ-মুখ ফুলে গেছে এবং চোখের ভেতরে রক্ত জমেছে। তবে শরীরের অন্য কোথাও আঘাত পাওয়া যায়নি। অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও তা যেকোনো সময় সংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে। মস্তিষ্ক ও চোখে আঘাত থাকায় তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, নুরুল হকের চিকিৎসায় উচ্চ পর্যায়ের ৬ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে ও জ্ঞান ফিরেছে। তবে ৪৮ ঘণ্টার আগে নুরুল হক আশঙ্কামুক্ত সেটি বলা সম্ভব নয়।
ঢামেক সূত্রে জানা গেছে, সাত সদস্যের মেডিক্যালে বোর্ডে নিউরোসার্জারি, নাক-কান-গলা, চক্ষু, ক্যাজুয়ালটি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা যুক্ত হয়েছেন। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা হলেন, ব্রি. জেনারেল ডা. মোঃ আসাদুজ্জামান, পেইন, এনেসথেসিয়া ও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম, চক্ষু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাক আহমেদ, নাক-কান-গলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমান, আবাসিক সার্জন (ক্যাজুয়েলিটি) ডা. মোস্তাক আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক (ক্যাজুয়েলিটি) ডা. আমিরুল ইসলাম ফকির ও ম্যাক্সিফেসিয়াল সার্জন ডা. রেজাউল ইসলাম। শনিবার বিকালে মেডিকেল বোর্ড বৈঠক করে তার চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করেন। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে চিকিৎসকেরা মনে করছেন, নুরুল হকের কোনো বড় ধরনের অস্ত্রোপচার আপাতত প্রয়োজন হবে না। তবে তার অবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হবে।
যেভাবে নুরের ওপর হামলা ঃ
শুক্রবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে বিজয়নগর কালভার্ট রোডে আল রাজী কমপ্লেক্সে দলীয় কার্যালয়ে গণঅধিকার পরিষদের নেতৃবৃন্দ অবস্থান করছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভবনের সামনে প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন চলছিল। দলের সভাপতি নুরসহ সবাই ভবনের সামনে রাস্তায় অবস্থান নেয়। এসময় গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের কাছে খবর আসে যে কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে নেতা-কর্মীরা মশাল মিছিল নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের অফিসের দিকে এগিয়ে আসছে। এই খবরে গণঅধিকার পরিষদের কর্মীদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিক তারা মিছিল নিয়ে বিজয়নগরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ওদিকে জাতীয় পার্টির একটি মিছিল ওইদিকে এগিয়ে এলে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে মিছিলের চলার পথ বিপরীত দিকে নিয়ে যায়। পুলিশের ধাওয়ায় গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা পিছু হটেনি। এখানেই পুলিশের সঙ্গে প্রথম পর্যায়ে সংঘর্ষ বাঁধে গণঅধিকার পরিষদের কর্মীদের সাথে। পুলিশের সাথে যৌথবাহিনীও সেখানে লাঠিচার্জ করে। এক পর্যায়ে নুর লাঠিচার্জের শিকার হন।
সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচার হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, নুরের ডান হাতে মোবাইল ফোন। প্রেস ব্রিফিং করার জন্য ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন নুর। একজন পুলিশ সদস্য তাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে দেখা যায়। নুর মাথায় হাত দিয়ে লাঠির আঘাত প্রতিহত করতে গিয়ে সিঁড়িতে পড়ে যান।
চিকিৎসাধীন নুরুল হককে দেখতে ও তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে গিয়েছেন বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। তারা এ ঘটনার দুঃখ প্রকাশ করেন।
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নূরের ওপর হামলার পুনরাবৃত্তি চান না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন নুরুল হকের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন তিনি।
এরপর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গণতন্ত্রের যে রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটি অতি শীঘ্রই শেষ করব। যাতে নূরের ওপর যে অত্যাচার হয়েছে, তা আর কোনোদিন বাংলাদেশে পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নুরুল হক নূরের সক্রিয় ভূমিকার কথা উল্লেখ করে মঈন খান বলেন, কেন তাকে এ পরিণতিতে আসতে হলো তা ভেবে দেখতে হবে। এমন নির্মম নির্যাতন বাংলাদেশের কোনো মানুষ মেনে নিতে পারে না। নির্বাচন প্রসঙ্গও তুলে ধরে মঈন খান বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কার্যকর করার একমাত্র উপায়। জনগণের ভোটের মাধ্যমে যারা নির্বাচিত হবে তারাই দেশ পরিচালনা করবে।
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জোনায়েদ সাকিরঃ
নুরের ওপর হামলার ঘটনার যথার্থ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। গতকাল শনিবার দুপুরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন নূরের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর কথা বলেন তিনি।
সাকি বলেন, আমরা এই হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছি। গণঅধিকারের একটি কর্মসূচি শেষে নূর ও রাশেদ খান প্রেস ব্রিফিংয়ের অপেক্ষায় ছিলেন। সেই সময় পুলিশ ও যৌথবাহিনী কিভাবে হামলা করল এবং এর পেছনে কারা দায়ী, তা অবিলম্বে ও যথার্থভাবে তদন্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচন এই তিনটি কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
এসময় গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানসহ পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।



