ফখরুলের বক্তব্যের প্রতিবাদে রংপুরে জামায়াতের ১১ এমপি

‘ভোট না দিলে উন্নয়ন হবে না—এমন কথা গণতন্ত্রবিরোধী’

জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়ায় রংপুরের উন্নয়ন কীভাবে হবে’—স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন রংপুর বিভাগের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা। একই সঙ্গে বক্তব্য প্রত্যাহার করে রংপুরের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাতে রংপুর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে রংপুর বিভাগের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

‘রংপুরের মানুষকে অসচেতন বলা অসম্মানজনক’

সংবাদ সম্মেলনে মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রংপুর অঞ্চলের মানুষের অভিভাবকতুল্য একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিক। কিন্তু সম্প্রতি রংপুর শিল্পকলা একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি রংপুরের মানুষ বিএনপিকে ভোট না দিয়ে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেয়—এমন মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে এর ফলে এলাকার উন্নয়ন কীভাবে হবে এবং রংপুরের মানুষের সচেতনতার অভাব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন।

বেলাল বলেন, ‘প্রথমত, এলজিআরডি মন্ত্রী রংপুরের মানুষকে অসচেতন বলে অসম্মান করেছেন। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ভোট না দিলে উন্নয়ন হবে না—এ ধরনের বক্তব্য গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

তার ভাষ্য, ভোট দেওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। মানুষ নিজের পছন্দ, বিবেচনা ও রাজনৈতিক বিশ্বাস অনুযায়ী ভোট দেবে। কোনো নির্দিষ্ট দলকে ভোট দেওয়ার বিনিময়ে উন্নয়ন দেওয়ার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তিনি বলেন, ‘একটি দলকে সবাই ভোট দিলে বিরোধী দল থাকবে না। আর বিরোধী দল ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক সরকার চলতে পারে না।’

বিরোধী দলের এমপি থাকলে উন্নয়ন হবে না—এমন বক্তব্য অগণতান্ত্রিক

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, একটি এলাকার সংসদ সদস্য কোন দলের—তার ওপর উন্নয়ন নির্ভর করতে পারে না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য বিরোধী দলের হলেও তার নির্বাচনী এলাকার জনগণ সরকারেরই নাগরিক। ফলে সরকারি উন্নয়ন থেকে ওই এলাকার মানুষকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই।

তার মতে, উন্নয়নের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ভোট দেওয়ার বিষয়টি যুক্ত করা ‘অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক ও অযৌক্তিক’।

মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘বিরোধী দলের এমপি থাকার কারণে এলাকার উন্নয়ন হবে না—এটি গণতান্ত্রিক কথা হলো না। উন্নয়নের সঙ্গে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার বিষয়টি যুক্ত করা অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক ও অযৌক্তিক।’

তিনি অবিলম্বে মির্জা ফখরুলের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। একই সঙ্গে আগামী দিনে রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

ফখরুলের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ২৭ জুলাই রংপুর সফরে এসে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। ওই সময় তিনি রংপুর শিল্পকলা একাডেমিতে একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। সরকারি ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই সফরে তিনি গ্রামীণ নারীদের হস্তশিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, কর্মসংস্থান এবং রংপুর অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামীণ নারীদের উৎপাদিত হস্তশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিতে সরকার সহযোগিতা করবে এবং বেকার নারী-পুরুষকে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সেই সফরেই রংপুরের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও ভোটের ধরন নিয়ে মির্জা ফখরুলের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে বলে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা দাবি করছেন।

এর আগে ২৭ জুলাই রংপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মির্জা ফখরুল জামায়াতের বিএনপিকে ‘ফ্যাসিবাদী দল’ আখ্যা দেওয়ার সমালোচনা করেন এবং বিএনপিকে ‘উদার গণতান্ত্রিক দল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ওই সময় রংপুর-৩ আসনের জামায়াতের এমপি মাহবুবুর রহমান বেলালসহ স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও সরকারের সমালোচনা

সংবাদ সম্মেলনে রংপুরের উন্নয়ন বৈষম্যের পাশাপাশি দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও কথা বলেন জামায়াতের এমপিরা।

মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, বর্তমানে সারাদেশে বিদ্যুতের সংকট দেখা দিয়েছে। তাদের ধারণা, সরকারের ভেতরে থাকা কিছু মানুষের কারসাজির কারণে এ সংকট তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে বিষয়টি তদন্ত করে জনগণের স্বার্থে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

তিনি বলেন, ‘সরকারকে জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা স্মারকলিপি দিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার দ্রুত এ সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’

রংপুরে জামায়াতের নির্বাচনী উত্থান

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রংপুর বিভাগের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। নির্বাচনের পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে রংপুরে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির দুর্বলতার বিপরীতে জামায়াতের উত্থানের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার নির্বাচনী তথ্যেও রংপুর বিভাগে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের উল্লেখযোগ্য আসনজয়ের চিত্র উঠে এসেছে।

রংপুর বিভাগের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জামায়াতের ১৭টি আসন এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ১৯টি আসন পাওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে ভোটের রাজনীতিতে রংপুরে জামায়াতের শক্ত অবস্থান তৈরি হওয়ার বিষয়টি এখন জাতীয় রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে।

‘উন্নয়ন বনাম ভোট’ বিতর্ক

জামায়াতের এমপিদের সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে—ভোটের রাজনৈতিক পছন্দের সঙ্গে সরকারি উন্নয়নকে যুক্ত করা উচিত কি না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এটি বাংলাদেশের পুরোনো ‘উন্নয়ন বনাম রাজনৈতিক সমর্থন’ বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি নির্বাচনী এলাকার মানুষ যে দলকেই ভোট দিক না কেন, নির্বাচনের পর ওই এলাকার সড়ক, সেতু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব—এমন বক্তব্যই সংবাদ সম্মেলনে জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন জামায়াতের এমপিরা।

তাদের অভিযোগ, কোনো নির্দিষ্ট দলকে ভোট না দিলে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার বার্তা দেওয়া হলে তা ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

রংপুরের আঞ্চলিক দাবিতে জামায়াতের সক্রিয়তা

সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আঞ্চলিক বিভিন্ন দাবি নিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেছে। গত ১১ জুলাই রংপুর জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবি জানানো হয়।

ওই সমাবেশে রংপুর বিভাগের নির্বাচিত জামায়াতের সংসদ সদস্যদেরও উপস্থিতি ছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মাহবুবুর রহমান বেলাল, অধ্যাপক গোলাম রব্বানী, অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার, আব্দুল করিম সরকার, মাহবুবুল আলম সালেহী ও রায়হান সিরাজীসহ জামায়াতের এমপিদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, রংপুরের আঞ্চলিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনের প্রশ্নে জামায়াত এখন সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি মাঠের রাজনীতিতেও নিজেদের অবস্থান জোরালো করছে।

সংবাদ সম্মেলনে যারা ছিলেন

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত জামায়াতের সংসদ সদস্যদের মধ্যে ছিলেন—নীলফামারীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস ছাত্তার, ওবায়দুল্লাহ সালাফি, আল ফারুক আব্দুল লতীফ, আব্দুল মুনতাকিম; গাইবান্ধার মাজেদুর রহমান, আব্দুল করিম সরকার, মাওলানা আবুল কাওসার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ এবং রংপুরের রায়হান সিরাজী ও অধ্যাপক গোলাম রব্বানী।

তবে সংবাদ সম্মেলনে ১১ জন সংসদ সদস্য থাকার কথা বলা হলেও সরবরাহ করা উপস্থিতির তালিকায় ১০ জনের নাম রয়েছে। ফলে ১১তম সংসদ সদস্যের নাম নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা উল্লেখ না করাই তথ্যগতভাবে নিরাপদ।

রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই রংপুর বিভাগের একটি আসনের সংসদ সদস্য এবং বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী। ২০২৬ সালের মন্ত্রিসভায় রংপুর বিভাগ থেকে চারজন সংসদ সদস্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, নির্বাচনে রংপুরে জামায়াতের শক্ত অবস্থান তৈরি হওয়ায় এই অঞ্চলের রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে উন্নয়ন, ভোটের অধিকার, আঞ্চলিক বৈষম্য, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও বিদ্যুৎ সংকটের মতো বিষয়গুলোকে ঘিরে দুই দলের রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য সামনে আসতে পারে।

জামায়াতের এমপিদের সংবাদ সম্মেলন সেই রাজনৈতিক টানাপোড়েনেরই নতুন বহিঃপ্রকাশ। এখন দেখার বিষয়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বক্তব্যের বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেন বা বক্তব্য প্রত্যাহার করেন কি না এবং সরকার রংপুরের উন্নয়ন বৈষম্য নিয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments