নতুন আইনের মাধ্যমে মামলা তদন্তের ক্ষমতা পেয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। তবে সব মামলা নয়, সরকার, আদালত বা আইজিপির মাধ্যমে ন্যস্ত করা মামলাই তদন্ত করবে পুলিশের এ বিশেষায়িত ইউনিট। পাশাপাশি সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আলাদা সেল গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন আইনে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে এপিবিএনের দায়িত্বও আইনে স্পষ্ট করা হয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরও জনবল দেওয়ার পাশাপাশি নতুন একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে এপিবিএন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় এপিবিএন সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এপিবিএনের ডিআইজি (প্রশাসন) ড. মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নতুন আইনে এপিবিএনের জন্য মামলা তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও পার্বত্য এলাকায় ভৌগোলিক ও বাস্তবতার কারণে যেসব অপরাধের তদন্তে জেলা পুলিশের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে এপিবিএন তদন্ত করতে পারবে। তবে এপিবিএন সব মামলা তদন্ত করবে না। সরকার, আদালত বা আইজিপি যেসব মামলা এপিবিএনের কাছে ন্যস্ত করবেন, শুধু সেসব মামলাই তদন্ত করা হবে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের আগমনের পর ক্যাম্প এলাকায় মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, নারী নির্যাতন, মানবপাচারসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বেড়েছে। দূর-দূরান্তে গিয়ে এসব অপরাধের তদন্ত জেলা পুলিশের জন্য অনেক ক্ষেত্রে জটিল হয়ে ওঠে। এ কারণে সরকারের অনুমতি নিয়ে এপিবিএনের নিরস্ত্র উপপরিদর্শকদের ক্যাম্পে তদন্তের কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। নতুন আইনে এ কার্যক্রমের আইনগত ভিত্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে এপিবিএনের প্রায় ২ হাজার ২০০ সদস্য রয়েছেন জানিয়ে ডিআইজি বলেন, এত বড় জনগোষ্ঠীর তুলনায় পুলিশের সদস্যসংখ্যার অনুপাত একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে ক্যাম্প এলাকায় আরও জনবল দেওয়ার পাশাপাশি নতুন একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, ক্যাম্পে মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, নারী নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও কাজ করছে এপিবিএন। ক্যাম্পের ভেতরের নিরাপত্তার দায়িত্ব মূলত এপিবিএনের। সমুদ্রসীমা ও সীমান্তে দায়িত্ব পালন করে কোস্টগার্ড, বিজিবি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বাহিনী।
বিমানবন্দর প্রসঙ্গে ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, দেশের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে বিমানবন্দরেও পুলিশের এখতিয়ার রয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখতে হবে। পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে অপরাধ দমন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বেসামরিক নিরাপত্তা রয়েছে। বিমানবন্দরের কোনো অংশ পুলিশের এখতিয়ারের বাইরে—এমন ধারণার সুযোগ নেই। বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে।
বিমানবন্দরে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত এপিবিএন করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন আইনে এতে কোনো বাধা নেই। কোনো অপরাধের তদন্ত এপিবিএন করবে বলে সিদ্ধান্ত হলে আইনে তাতে বাধা নেই।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এপিবিএনের অভিযানের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ২৩টি যানবাহন আটক করে শাহপরীর দ্বীপ হাইওয়ে থানায় পাঠানো হয়েছে। বিক্রি নিষিদ্ধ রেশন সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনায় একটি মামলা করে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন চোরাচালানি ও অবৈধ পণ্য উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে তিনটি নিখোঁজ শিশু ও ১৯ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়। আগস্টে ৮, ১৪ ও ১৬ এপিবিএন মিলে ৪৩টি জিআর/সিআর মামলা করেছে।
এপিবিএনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে প্রযুক্তির সহায়তায় ৭৮৪টি হারানো মোবাইল ফোন, তিনটি হ্যাকড ফেসবুক আইডি, দুটি হোয়াটসঅ্যাপ, দুটি ই-মেইল ও একটি টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করা হয়েছে। ৯৯৯-এর মাধ্যমে সহায়তা পেয়েছেন ৫৭২ জন। বিকাশ ও নগদ প্রতারণার ৭ লাখ ৪৯ হাজার ৭১৮ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানে ৬ হাজার ৬৫২টি ইয়াবা, ৩ দশমিক ৪৯ কেজি গাঁজা, ৪৩ দশমিক ৭৫ লিটার মদ, ৩৮৭ কার্টন সিগারেট ও ২০৯টি ভেপ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১১টি মামলা করে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দুটি ওয়ান শুটার গান, তিন রাউন্ড গুলি ও দুটি গুলির খোসা উদ্ধার এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ৪ হাজার ৯২৯ গ্রাম সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য ৯ কোটি ৭৯ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮৫ টাকা। এ ঘটনায় ১৭টি মামলা করে ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও ২ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭৬ টাকা বাংলাদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ৪৮৩টি মামলা করে ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস ও ইন্টেলিজেন্স) নুরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার (ইন্টেলিজেন্স) আসমা বেগম রিটা, পুলিশ সুপার (ট্রেনিং, ল’ অ্যান্ড মিডিয়া) মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ এপিবিএন সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



