মোঘলহাট সীমান্তে আজও অদম্য নূরলদীন

সাঈফ ইবনে রফিক

হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা জলধারা ভুটানের পাহাড় আর ডুয়ার্সের বন-জনপদ পেরিয়ে ধরলা নাম নিয়ে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে। সেই ধরলার তীরেই মোঘলহাট, উত্তরের এক প্রাচীন সীমান্ত জনপদ, যার ভূগোল যেমন অস্থির, ইতিহাসও তেমনি স্তরবহুল।

লালমনিরহাটের মোঘলহাটে পা রাখতেই চোখে পড়ে বিস্তৃত নদী, চর, দূরের সবুজ মাঠ, নদীর পাড় ঘেঁষে জনবসতি। বর্ষায় ধরলা উদ্দাম, শুষ্ক মৌসুমে শান্ত। পানি সরে গেলে চর জাগে, স্রোতে বদলে যায় গতিপথ। নদী যেন প্রতিটি ঋতুতে নিজেকেই নতুন করে লেখে। এই বদলে যাওয়া ভূপ্রকৃতিই মোঘলহাটকে একদিকে সুন্দর, অন্যদিকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য কঠিন করে তুলেছে।

নামটির মধ্যেও আছে ইতিহাসের ছাপ। কথিত আছে, ১৬৮৭ সালে কোচবিহার অভিযানে বেরিয়ে মোগল ফৌজদার এবাদত খাঁ ধরলার তীরে একটি ছাউনি বা হাট বসিয়েছিলেন। সেই ‘মোগল’ আর ‘হাট’ থেকেই মোঘলহাট নামের উৎপত্তি। রাজশক্তি বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, নামটি টিকে আছে।

আরেক ইতিহাস লেখা আছে জং ধরা রেলের পাতে। ১৮৮২ সালে ব্রিটিশ আমলে তিস্তা থেকে মোঘলহাট পর্যন্ত ন্যারোগেজ রেলপথ নির্মিত হয়। ১৯০১-০২ সালে কাউনিয়া-মোঘলহাট-গীতালদহ অংশ মিটারগেজে রূপান্তরিত হয়। ১৯০২ সালে রেলপথ পৌঁছে যায় গোলকগঞ্জে, আর ১৯০৬ সালে ফকিরাগ্রাম-কোকরাঝাড় হয়ে সেই যোগাযোগ বিস্তৃত হয় আসামের আমিনগাঁও পর্যন্ত। মোঘলহাট তখন পূর্ববঙ্গ হয়ে আসামে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলদ্বার, যাত্রী, পণ্য ও বাণিজ্যের কোলাহলে বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগের এক সক্রিয় কেন্দ্র।

আজ সেই রেলপথ নীরব। স্টেশনমাস্টারের পরিত্যক্ত কক্ষে গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। জং ধরা লাইনের ওপর ঘর তুলেছেন নদীভাঙা মানুষ। কোথাও রেলের পাত মা ঘরের নিচে, কোথাও আগাছার আড়াল থেকে উঁকি দেয় লোহা। তবু সেখানে দাঁড়ালে কল্পনায় কানে বাজে শতাব্দী পুরোনো রেলের হুইসেল। ইতিহাস আছে, শুধু তার কোলাহলটি নেই।

এই জনপদের স্মৃতি অবশ্য রেলের চেয়েও পুরোনো। নূরলদীন মুক্তমঞ্চের সামনে দাঁড়ালে মনে পড়ে উত্তরবঙ্গের সেই ঐতিহাসিক আহ্বান, জাগো বাহে, কোনঠে সবায়! আঠারো শতকের শেষভাগে কোম্পানি শাসন ও স্থানীয় শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন নূরলদীন। তাঁর বিদ্রোহ শুধু খাজনা বা জমির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না, হয়ে উঠেছিল শোষণ, ঔপনিবেশিক আধিপত্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রতীক। সেই অর্থে নূরলদীন একটি নামের চেয়ে বড়, তিনি প্রতিরোধের প্রতীক।

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর মোঘলহাটে সেই অদম্য অসীম সাহসিকতার আরেক রূপ চোখে পড়ে। ধরলার পাড়ে এখন দাঁড়িয়ে আছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সৈনিকরা। সময়, রাষ্ট্র, দায়িত্ব সবই আলাদা। তবু নিজের ভূখণ্ড, মানুষ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অটল থাকার মানসিকতায় নূরলদীনের সেই না-দমে-যাওয়া সাহসের প্রতিধ্বনি খুঁজে পাওয়া যায়।

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত মোঘলহাট বিজিবি ক্যাম্প বা বিওপির সৈনিকদের দৈনন্দিন জীবনেই তার প্রকাশ। কেউ রাতের অন্ধকারে পাহারায় দাঁড়ান, কেউ ভোরের কুয়াশায় চর পেরিয়ে টহলে যান, কেউ বদলে যাওয়া নদীপথে নৌকা নিয়ে পৌঁছে যান সীমান্তের প্রত্যন্ত প্রান্তে। যেকোনো আগ্রাসন, দখলদারিত্ব কিংবা সার্বভৌমত্বের হুমকির মুখে প্রতিটি বিজিবি সৈনিক তাই নিজ নিজ অবস্থানে একেকজন অদম্য নূরলদীন।

কিন্তু একটা বিজিবি ক্যাম্প বা বিওপির ভূমিকা শুধু সীমান্তরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়। মোঘলহাটের মতো জনপদে বিওপি রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান উপস্থিতি। এখানে একটি শিশু স্কুলে যাওয়ার পথে বিজিবির টহল দেখে, বাজারে দেখে, ক্ষেতে দেখে, নদীর প্রত্যন্ত চরে দেখে। সৈনিকদের নিয়মানুবর্তী জীবন, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ তার বেড়ে ওঠার দৃশ্যপটের অংশ হয়ে যায়। তার কাছে বিজিবি দূরের কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, প্রতিদিনের পরিচিত উপস্থিতি।

এই পরিচিতি থেকেই তৈরি হয় আস্থা। বিপদে-আপদে তাই মানুষ সবার আগে বিজিবিকেই ডাকে। বন্যা, নদীভাঙন কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে প্রথম সারিতে দাঁড়ান সীমান্তরক্ষীরা, কখনও উদ্ধারে, কখনও ত্রাণে, কখনও বিপদের মুহূর্তে পাশে থেকে। সীমান্তের মানচিত্রে একটি বিওপি ছোট্ট একটি বিন্দু হতে পারে, কিন্তু জনপদের জীবনে সেটিই এক বাতিঘর।

এই বাতিঘরের নিয়মিত কার্যক্রম যে কতটা কঠিন, বোঝা যায় ধরলার দিকে তাকালেই। স্থলসীমান্তে একটি পিলার বছরের পর বছর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, নদী সে নিয়ম মানে না। ধরলা কোথাও পাড় ভাঙে, কোথাও চর তোলে, কোথাও গতিপথ সরিয়ে দেয়। তার সঙ্গে নদীগর্ভে হারিয়ে যায় সীমান্ত পিলারের দৃশ্যমান চিহ্নও। অথচ নদী বদলালেও আন্তর্জাতিক সীমানা বদলায় না। ফলে মানচিত্রের স্থির রেখাকে অস্থির ভূখণ্ডে ধরে রাখার কাজ এখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল। নতুন চর জাগলে নজরদারি বাড়াতে হয়, নদীপথ বদলালে বদলাতে হয় টহলের ধরন। কোথাও নৌকায়, কোথাও পায়ে হেঁটে, কোথাও বিস্তীর্ণ বালুচর পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় সীমান্তের শেষ প্রান্তে।

এমনই এক প্রত্যন্ত চরে বিজিবির টহল দেখেছি। বিস্তীর্ণ বালুময় চরের বুকেও ইতস্তত সবুজ ঘাসের ঝোপ, রুক্ষতার মাঝে প্রকৃতির নিজস্ব আঁচড়। কোথাও আবার সেই বালুময় মাটিতেই সবজি ফলানোর প্রাণান্ত চেষ্টা। চোখের সামনে ভারতীয় সীমান্তের লাইটপোস্ট। দূরে গীতালদহের দিকে চোখে পড়ে ধরলার পুরোনো রেলসেতুর অবশিষ্টাংশ, একসময় যে সেতু মোঘলহাটকে যুক্ত করেছিল আসামমুখী রেলপথের সঙ্গে। পাশে ধরলার জল, দূরে জনবসতির অস্পষ্ট রেখা।

শহরে বসে আমরা যে নিরাপত্তাকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিই, তার বাস্তবতা এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে সীমান্ত রক্ষা মানে শুধু একটি রেখা পাহারা দেওয়া নয়। নদীর গতিপথ বুঝতে হয়, চর চিনতে হয়, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়, একই সঙ্গে ঠেকাতে হয় অবৈধ পারাপার ও চোরাচালান।

এই কঠোর বাস্তবতার বিপরীতে মোঘলহাট আশ্চর্য সুন্দর। বিকেলের আলো ধরলার পানিতে পড়লে সীমান্তের কঠিন ভূরাজনীতি কিছুক্ষণের জন্য আড়ালে চলে যায়। কৃষক মাঠ থেকে ফেরেন, দূরের চরে গরু চরে, নৌকা চলে ধীরগতিতে, বাতাসে ঘাসের ঝোপ দোলে। মনে হয়, এ নিছকই বাংলার এক শান্ত নদীতীরবর্তী জনপদ।

কিন্তু এই শান্তিরও পাহারাদার আছে। কারও কারও নিরলস পরিশ্রমের বিনিময়ে এই শান্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

ফেরার পথে আবার চোখে পড়ে পুরোনো রেলের পাত। একদিকে জং ধরা রেললাইন, থেমে যাওয়া সময়ের স্মৃতি। অন্যদিকে প্রবহমান ধরলা, নিরন্তর পরিবর্তনের প্রতীক। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মোঘলহাট বিওপি যেন বর্তমানের প্রহরী, এক হাতে থেমে যাওয়া সময়কে ছুঁয়ে, আরেক হাতে বহমান সময়কে ধরে রাখা এক নীরব সাক্ষী।

মোঘলহাট আসলে কয়েকটি সময়কে পাশাপাশি বয়ে নিয়ে চলেছে। মোগল আমলের নাম আজও মুখে মুখে ফেরে, নূরলদীনের বিদ্রোহের স্মৃতি মিশে আছে মাটির গভীরে, ব্রিটিশ আমলের রেললাইন জং ধরে ঘুমিয়ে আছে, আর ধরলা আজও ভাঙছে, চর জাগাচ্ছে, নিজের পথ নতুন করে লিখছে। শুধু প্রতিটি সময়ে এই জনপদের সামনে দাঁড়ানোর মানুষটি বদলেছে।

একসময় সেই প্রাণময় অদম্য সাহসিকতার নাম ছিল নূরলদীন। এক কণ্ঠস্বর, যিনি ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ডেকেছিলেন সবাইকে। আজ সেই ডাক আর একটি কণ্ঠে সীমাবদ্ধ নেই। মোঘলহাট বিওপির প্রতিটি সৈনিকের নিঃশব্দ উপস্থিতিতে যেন ছড়িয়ে আছে সেই আহ্বানের প্রতিধ্বনি। তাঁদের নাম হয়তো কোনো মুক্তমঞ্চে খোদাই হবে না, কিন্তু রাতের অন্ধকারে, ভোরের কুয়াশায় কিংবা উত্তাল ধরলার বুকে তাঁদের প্রহরাই এই জনপদের নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্বের দৃশ্যমান নিশ্চয়তা।

মোঘলহাট থেকে ফেরার পথে মনে হলো, ইতিহাস এখানে শুধু স্মৃতিতে নয়, প্রহরাতেও বেঁচে আছে। ধরলার পাড়ে, জং ধরা রেলের পাশে, বদলে যাওয়া প্রতিটি চরে আজও জেগে আছেন সেই অদম্য সাহসিকতার উত্তরাধিকারীরা। তাঁরা একটি জনপদ আগলে রাখেন, আর সীমান্তজুড়ে তাঁদের এই প্রহরাই আগলে রাখে বাংলাদেশ।

ফেরার সময় ধরলার বাতাসে যেন আরও একবার ভেসে এলো সেই পুরোনো, অথচ আজও প্রাসঙ্গিক আহ্বান, জাগো বাহে, কোনঠে সবায়!

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments